প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাধক-জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের ত্যাগের মশালেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আলোকিত হয়

মন্টু ডানিয়েল : তৃষ্ণার শেষ নেই। একজন মানুষের মনের তৃষ্ণা সাহারা মরুভূমির চেয়ে বেশী পিপাসিত হতে পারে। সাগরের সব জল ঢেলে দিলে সাহারার হাহাকার নিবারণ হবে হয়তো, কিন্তু মানুষের তৃষ্ণায় ৫-টি মহাসাগরের সকল জল এনে ঢেলে দিলেও নিবারণ হবার নয়। চাহিদার শেষ নেই, জয়ের নেশারও তৃপ্তি নেই।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু জানা হয়ে গেলে, পাওয়া হয়ে গেলে, মানুষ হয়তো সেদিন দম ফেঁটে মরে যাবে। কিন্তু তবু হয়তো তার নিজেকে জানা ও আবিস্কার করার শেষ হবে না। চন্দ্র বিজয় করে নীল আর্মট্রং, মাইকেল, এডুইনরা পৃথিবীতে ফিরে এসে করজোড়ে জানু পেতে বসে ছিলেন। ঈশ্বরকে খোঁজাখুজির জন্যে নয়, নিজেকে আবিস্কারের জন্যে। নিজের ভিতরের অজানা রহস্যতৃষ্ণার কাছে মহাশূন্যের আবিস্কার যেন সামান্যই। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আইন্সটাইন, নিউটন, গ্যালিলিও প্রমূখরা বলে যেতে পারেননি, মহাকাশ ও মহাকালের সব রহস্য, এমনকি নিজের ভিতরের অসংখ্য প্রশ্ন ও অপরিসীম শক্তির ৫% ও জানতে পারেননি!

আমরা যে যথার্থ কী, আমরা কে যে কী করছি, তার পরিণাম কী, তার তাৎপর্য কী, সেটি স্পষ্ট করে বোঝা সহজ কথা নয়। বিশ্ব জয় করে মহামতি আলেক্সাজাণ্ডার জয়ের নেশায় এতই তৃষ্ণার্থ হয়ে উঠেছিলেন যে, এই রকম আরেকটি পৃথিবী থাকলে সেটিও তিনি জয় করে ছাড়তেন, বলেছিলেন। আবার এই আলেক্সজাণ্ডারই মৃত্যুর আগে আফসোস করে বলে গেলেন ‘নিজেকে জয় করতে না পারলে সকল অর্জন বৃথা।’

চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স যার যত বেশী আছে তার জীবন তত সফল, এ রকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে আছে জগৎ সংসারে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রায় সবারই ইচ্ছা হয় একবার অঢেল সম্পদ ও প্রাচুর্য-জৌলুসের মালিক হবার, বলা যায় ৯৯.৫% মানুষ এ ভাবনার পূজারী। বিপরীতে ঐ মণীষী ডায়োসেনিস, যাকে লোক পাঠিয়েও অরণ্যবাস থেকে নিজ দরবারে ডেকে নিতে পারেননি আলেক্সজান্ডার; অতঃপর তিনি স্বয়ং সাধক ডায়োসেনিসের কাছে এসে কিছু দিতে চাইলেও তিনি প্রতিউত্তরে বলেছিলেন তার কিছু লাগবে না, আলেক্সজাণ্ডারের ভান্ডারে এমন কিছু নেই যে তিনি দিতে পারেন, উল্টো তিনি বরং ডায়োসেনিসের সূর্যালোক প্রাপ্তির সুযোগকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে আছেন, যা করার অধিকার তার নেই। আমরা প্রায় সবাই এ রকম অনধিকার চর্চা করেই বলশালী থাকছি। ক্ষমতার বলে পৃথিবীর প্রায় ৮৫% সম্পদ মাত্র ১৫% মানুষ দখল করে বসে আছে।

অথচ বিশ্বজোড়া ০.০৫% সাধক-জ্ঞানী-বিজ্ঞানী, যাদের ত্যাগের মশালেই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আলোকিত হয়। তাঁদের সব চিন্তার চেয়ে সত্য তৃষ্ণা হচ্ছে নিজেকে জানার, সুখী হবার ইচ্ছা নয়। গ্যালিলিও সকল সুখ বিসর্জন দিয়ে কারামৃত্যু বরণ করে নিয়েছিলেন, পৃথিবী সূর্য্যের চারিদিকে ঘুরে এ সত্যতৃষ্ণাকে জীবিত রাখার জন্যে। নিজেকে জানার জন্মজাত ইচ্ছাকে যে জাতি যত মর্যাদা দেয় সেই-ই পায় বিশ্বাসন, স্বর্গাসনও পায় হয়তো। নিজেকে জানার তৃষ্ণা পরিণামে মানুষকে ভালবাসতে শেখায়, সহমর্মী হওয়ায়, বিপরীতে স্বার্থবাদিতা চেনায় আমার অহংকে, ভোগ-বিলাসিতাকে, আর পশুত্বকে।

খাদ্য গুদামজাত করে রাখার কারণে প্রতিদিন বিশ্বে ২৫-হাজার মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে, এ বিষয়েও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সকল কিছুতে আমার, আমার করার সীমাহীন লোভ, এ লোভের কারণে সৃষ্ট দানবীয় তৃষ্ণার গলায় টুটি চেপে ধরতে না পারলে কল্যাণ চিন্তার ভাবনা মরুভূমির বালির নিচে চাপা থেকেই একদিন মরে যাবে।

মানুষ যে তার স্বপ্নের চেয়ে বড়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চেয়ে অধিক রহস্যময় এটি আবিস্কার করতে না পারা পর্যন্ত চোখ বাঁধা কুলুর বলদের ন্যায় ঘানি টানতে টানতেই একদিন জীবনের সাঙ্গ হবে। বিখ্যাত গানটি তখন ভিতরে অনুরণিত হতে থাকবে, ‘এ জীবনের পাতায়, পাতায়, যা লেখা, ভুল, সব-ই ভুল।’ /সম্পাদনা: রাশিদ

লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি ও সমাজ সংস্কারকর্মী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত