প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] করোনায় লণ্ডভণ্ড হকারদের জীবন, পেশা ছেড়েছেন ১০ শতাংশ

সুজন কৈরী: [২] কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে থেমে থেমে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ জনজীবন। করোনা প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত লকডাউন চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। এরমধ্যে রয়েছেন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

[৩] ব্যবসা বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তারা। চক্ষুলজ্জায় কারও কাছে হাত পাততে পারেননি তারা। কেউ কেউ চলে গেছেন গ্রামে। দীর্ঘ লকডাউনে সংসার চালাতে গিয়ে জমানো টাকা ও ব্যবসার পুঁজি খুঁইয়েছেন অধিকাংশই। আবার কেউ ধার-দেনা করে কোনোভাবে চালিয়েছেন সংসার। অনেকেরই বাকি বাসা ও দোকান ভাড়া। সন্তানের স্কুলের বেতন আটকে গেছে কারো কারো। এতে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।

[৪] তবে লকডাউন তুলে দেওয়ার পর সচল হতে শুরু করেছে রাজধানীর ফুটপাতগুলো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধীরে ধীরে দোকান বসাতে শুরু করেছেন হকাররা। গুলিস্তানের ফুটপাত, বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল সড়ক মার্কেট, গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সসহ আশপাশ ঘুরে দেখো যায়, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুটপাতের দোকানগুলো ভিড় জমাচ্ছেন। কেনাকাটা করছেন পছন্দের ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এসব ক্রেতাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের।

[৫] গুলিস্তান ফুটপাতে জুতার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, তিনি ২৭ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে তিনি ভাল কেনাবেচা করতেন। কিন্তু করোনা তার ব্যবসার সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। দীর্ঘ লকডাউনের কারণে বসে বসে পুঁজি ভেঙে খেয়েছেন। সংসার চালিয়েছেন। লকডাউন তুলে নেওয়ার পর জমানো কিছু টাকা দিয়ে আবারও শুরু করেন ব্যবসা। বেচাকেনাও মোটামুটি হচ্ছে। গত কয়েক দিনে তা বেশ বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আরও বাড়বে।

[৬] বেল্ট বিক্রেতা সোহেল জানান, লকডাউনে তার কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। দোকান নিয়ে বসতে পারায় দেনা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। লকডাউনের পর প্রথম কয়েকদিন বেচাকেনা কম থাকলেও এখন প্রতিদিনই ধীরে ধীরে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে তার। গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের একটি দোকানের সেলসম্যান জাহিদ বলেন, থেমে থেমে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় লোকসান হয়েছে বেশ। সর্বশেষ সরকার লকডাউন তুলে নিলে দোকান খুলেছি। মোটামুটি বিক্রিও হচ্ছে। লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।

[৭] এদিকে বেচাকেনা বাড়লেও লোনের কিস্তিসহ নানামুখী চাপে রয়েছেন এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, পাওনাদারের টাকা পরিশোধসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এসব সমাধানে যে টাকার প্রয়োজন তার অর্ধেকও বেচাকেনা হচ্ছে না বলে অনেকে ব্যবসায়ীর অভিযোগ।

[৮] গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল সড়ক মার্কেটের মোবাইল মেকানিক শাহজাহান বলেন, নানা চাপে আছি। দিনে মাত্র দু-তিন হাজার টাকা আয়। চাহিদা অনুযায়ী চলতে হচ্ছে।

[৯] একই মার্কেটের ফুচকা বিক্রেতা খলিল জানান, লকডাউনে ধারদেনা করে চলেছেন। অনেকে এখন চাপ দিচ্ছেন। কম করে হলেও টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচসহ পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে এক বছর লাগবে সব কাটিয়ে উঠতে।

[১০] বঙ্গবন্ধু স্কয়ার পাতাল সড়ক মার্কেট সমিতির সভাপতি সোহরাব হোসেন নান্নু বলেন, দোকান তুলে দেওয়া বা বসানো এটি সিটি কর্পোরেশনের বিষয়। আমরা মার্কেটে যদি কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যে, দোকান ভাড়া দিতে পারছে না তবে মালিক ও দোকানদারকে নিয়ে সমাধানে আসার চেষ্টা করি। বেচাকেনার বিষয়ে নান্নু বলেন, করোনার আগে যে বেচাকেনা হতো তার ২০-৪০ শতাংশ বেচাকেনা এখন কম হচ্ছে।

[১১] বাংলাদেশ হকার ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, লকডাউন তুলে দেওয়ার পর হকাররা বসতে শুরু করেছে। কিন্তু পুঁজির অভাবে ব্যবসা করা পারছেন না অধিকাংশই হকার। লকডাউনে জমানো পুঁজি খরচ করে ফেলেছেন। সংসার চালিয়েছেন।

[১২] তিনি জানান, বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ হকার রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে এখনও ব্যবসায় ফিরেননি। আবার অনেকে ব্যবসা পরিবর্তন বা ছেড়ে দিয়েছেন। এর সংখ্যা ১০ শতাংশ। আর যারা করছেন তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ নানাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। আবার অনেকে টাকার অভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না।

[১৩] সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, লকডাউনের সময় সরকার কর্মহীন হকারদের প্রণোদনা ও বিনা সুদে লোন প্রদানের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে হকাররা তা পায়নি। লকডাউনের সময় হকার শ্রমিকরা তাদের ব্যবসায়িক পুঁজি শেষ করে ফেলে বর্তমানে পুজির অভাবে ব্যবসা করতে পারছে না। এই সংকটের সময় হকারদের ব্যবসার পুঁজির জন্য বিনা সুদে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ব্যাংক লোন দিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি আমরা।

[১৪] লকডাউন শেষে রাজনৈতিক ছাত্রছায়ায় স্বার্থন্বেষী মহল সিটি কর্পোরেশনের নামে ফুটপাতে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ করেন এই হকার নেতা। এটিও বন্ধে সরকারের কাছে আমরা দাবি জানিয়েছি।

[১৫] ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ রতন বলেন, গুলিস্তানে বেচাকেনা আগের মতো ফিরে আসছে। মার্কেট, ফুটপাতসহ রাস্তায় হকাররা দোকান নিয়ে বসছেন। আমি অনুরোধ করবো, তারা যেন রাস্তায় না বসেন। এতে যানজট বাড়বে এবং মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে। সম্পাদনা : ভিকটর রোজারিও

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত