প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ই-কমার্স: ফেসবুক কেন্দ্রিক কারো নিয়ন্ত্রণ নেই, অভিযোগ বেড়েছে কয়েক গুণ

নিউজ ডেস্ক: ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণায় গ্রাহকদের মধ্যে ই-কমার্স নিয়ে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ফেসবুককেন্দ্রিক শত শত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিদিনই প্রতারণা করে যাচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটের উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেছেন, এখন ই-কমার্সে অভিযোগের পরিমাণ আগের চেয়ে বহু গুণ বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ই-কমার্স এখন সম্প্রসারণের পথে। এখনই এমন ধাক্কা সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে। ফলে সরকারকে দ্রুতই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এখন আস্থা ফেরানোর একটাই পথ, দোষীদের দ্রুত শাস্তি দিতে হবে। যারা এই ধরনের কাজ করছে, তাদের কাজটা বন্ধ করতে হবে।’

সম্প্রতি ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক বনানী থানার ওসি তদন্ত শেখ সোহেল রানা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ‘নিরাপদ ডটকম’ নামের একটি ই-কমার্স সাইটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকেও (সিইও) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শাহরিয়ার খান নামে ঐ ব্যক্তি ই-কমার্স সাইট খুলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেন। ৫০ শতাংশ মূল্য ছাড়ে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, ওভেনসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য ৩০ দিনের মধ্যে হোম ডেলিভারি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন।

ই-ভ্যালির বিরুদ্ধেও গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো গ্রাহক তাদের অফিসের সামনে ভিড় করছেন। কিন্তু প্রতারিত গ্রাহকদের জন্য কোনো সুখবর দিতে পারছেন না কেউ। বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পণ্য দিচ্ছে না, এটা সত্য। এখন এদের গ্রেফতার করে জেলে ভরলে তো গ্রাহক টাকা ফেরত পাবেন না। আমার পরামর্শ হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের তরফ থেকে প্রশাসক বসিয়ে তাদের যে প্রোপার্টি আছে সেটা বিক্রি করে সব টাকা দেওয়া না গেলেও যতটা সম্ভব টাকা গ্রাহকদের দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে সার্কুলার জারি করা হয়েছে, সেটা যদি সবাই মানেন তা হলে এখানে প্রতারণা অনেক কমে যাবে। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে যেটা করছি, সেটা হলো যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের ডেকে সমাধান করতে বলছি। না করলে মন্ত্রণালয়ে আমরা লিখিতভাবে জানাচ্ছি, পাশাপাশি তারা আমাদের সদস্য হলে তাদের সদস্যপদও স্থগিত করছি। আমরাও চাই এই সেক্টরে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসুক।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা মহামারির শুরু থেকে যে কয়েকটি খাতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে তার মধ্যে ই-কমার্স একটি। বছরের ব্যবধানে এ খাতে লেনদেন বেড়েছে ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে ই-কমার্সের বাজার ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরেও ছিল ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। জানা যায়, ২০১৬ সালের পর থেকে দেশে ই-কমার্স ব্যবসার প্রবৃদ্ধি হতে শুরু করেছে। ২০১৭ সালে ই-কমার্স বাজারের আকার ছিল ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমাদের দেশে তো ই-কমার্স কেবল সম্প্রসারণ হতে শুরু করেছে। এটা আরও বহুদূর যাবে। কিন্তু তার আগে যে প্রতারণা ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলোর সুরাহা করতে হবে। কোনো গ্রাহক এই প্ল্যাটফরমে পণ্য কিনতে এবার প্রতারণার শিকার হলে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। ফলে যারা প্রতারণা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের প্রতারণা সামনের দিনে ঘটতেই থাকবে।’ ফেসবুককেন্দ্রিক শত শত প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আপনি তো ফুটপাতে কোনো পণ্য কিনতে গিয়ে ঠকতে পারেন। ফেসবুকেরটা হলো ফুটপাতের মতো। কিন্তু মূল যারা ই-কমার্স ব্যবসা করছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ‘সাইবার ক্রাইম ট্রেন্ড ইন বাংলাদেশ ২০২০’ শীর্ষক বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সারা দেশে যত ধরনের সাইবার অপরাধ হয়েছে, তার মধ্যে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশই অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা। প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। আর দশমিক ৯২ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের কম। গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরুষরাই অনলাইন কেনাকাটায় বেশি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতারিতদের মধ্যে পুরুষ ৭ দশমিক ৩৮ আর নারী ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর বলেন, ‘ই-কমার্সে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, গ্রাহককে সচেতন হতে হবে। এখন যেমন ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেম আছে। গ্রাহক যদি কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্যাশ অন ডেলিভারি করে কেনাকাটা করেন তা হলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। যে কোনো পণ্য এখন চাইলেই ক্যান অন ডেলিভারি কিনতে পারেন। এভাবে কিনলে যে প্রতারক সে আপনাকে প্রোডাক্ট পাঠাবেই না। তা হলে তো আর আপনি প্রতারিত হবেন না।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, নগদের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠানও ই-কমার্সে প্রতারণার শিকার হয়েছে। কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নগদের বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে গেছে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে নগদের প্রায় ১২ হাজার গ্রাহকের একাউন্ট বন্ধ করতে হয়েছে। কীভাবে এই টাকা উদ্ধার করা যায় সে চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২ হাজারের বেশি ওয়েবসাইটভিত্তিক এবং প্রায় ১ লাখের মতো ফেসবুকভিত্তিক ই-কমার্স সাইট চালু রয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত