প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত

বণিক বার্তা: বাস চলাচলের জন্য বিমানবন্দর-গাজীপুরের মধ্যে বিশেষায়িত লেন (বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি) গড়ে তুলছে সরকার। লেনটি নির্মাণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিবিআরটিসিএল)। এরই মধ্যে প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ শতাংশ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ডিসেম্বরে চালু হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম বিআরটি। সরকারি কোম্পানির মাধ্যমে নির্মাণ হলেও এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি করে দেয়া চারটি ‘বিজনেস মডেল’ থেকে একটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্মতি এবং ঢাকা বিআরটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর এ-সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় ঠিক করা হবে বলে ডিবিআরটিসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিআরটি গড়ে তোলা হচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কের বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশে। মহাসড়কটির মাঝে গড়ে তোলা হচ্ছে দুই লেনের বিআরটি করিডর। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডরে কোথাও কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই বাস চলাচল করবে। তবে এ করিডরে কোম্পানি অনুমোদিত নির্দিষ্টসংখ্যক (৫০-১০০টি) বাসই চলতে পারবে। সাধারণ বাস ও অন্যান্য যানবাহন চলবে দুই পাশের ‘মিক্সড ট্রাফিক’ লেনে।

বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটিতে বাস পরিচালনার জন্য ডিবিআরটিসিএলকে চারটি মডেল তৈরি করে দিয়েছিল বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন। প্রথমটি ‘পাবলিক সেক্টর মডেল’। এ মডেলে বাস পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) মতো অভিজ্ঞ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়ার কথা বলা হয়।

বাকি তিন মডেলে বেসরকারি খাতে পরিচালনার ভার দেয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ‘কমপ্লিট প্রাইভেট অপারেশনস’ মডেল অনুযায়ী বিআরটির সব দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়। এক বা একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত রাজস্বের নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে বাস পরিচালনার জন্য লাইসেন্স দেয়ার কথা বলা হয় ‘নেট কস্ট কন্ট্রাক্ট’ (এনসিসি) মডেলে।

আর ‘গ্রস কস্ট কন্ট্রাক্ট’ (জিসিসি) মডেলে বলা হয়, বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটির ভাড়া নির্ধারণ ও আদায় করবে ডিবিআরটিসিএল। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি অপারেটর প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বাস পরিচালনা করবে। এক্ষেত্রে বাসের চালক ও কর্মী, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব কোম্পানিকেই পালন করতে হবে। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী, নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেবে কোম্পানি।

এ চারটি থেকে জিসিসি মডেল অনুযায়ী বিমানবন্দর-গাজীপুর পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছেন ডিবিআরটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিআরটি-৩ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে আমরা এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছি। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য এডিবির সম্মতির দরকার হবে। পাশাপাশি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদেরও অনুমোদন লাগবে। প্রস্তাবিত মডেলগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে আমরা জিসিসি মডেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এ মডেলের কিছু বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জিসিসি মডেল অনুযায়ী, ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব কোম্পানির। কিন্তু কোম্পানি নিজে ভাড়া আদায় করবে, নাকি অপারেটরকে দায়িত্ব দেয়া হবে—তা আরো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

কোম্পানি কেন নিজেই বিআরটি পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কম-বেশি ১০০টির মতো বাস চলবে বিআরটি করিডরে। কোম্পানি যদি নিজেই পরিচালনা করতে চায়, তাহলে অন্তত ২০০ চালক নিয়োগ দিতে হবে। ব্যবস্থাপনার জন্যও কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। বিপুলসংখ্যক কর্মীর পেছনে মোটা অংকের টাকা খরচ করার চেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করাই আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। এছাড়া আমরা বিআরটিসির মতো কোম্পানি হতে চাই না। আমরা এমন একটি কোম্পানি হতে চাই, যা যাত্রীদের সর্বোচ্চ উপকারে আসবে।

এক সময় বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তার মতে, করিডরটি পরিচালনার জন্য জিসিসি মডেল সবচেয়ে ভালো। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এ বিজনেস মডেল অনুযায়ী, বিআরটি পরিচালনার সব দায়দায়িত্ব কোম্পানির কাছেই থাকবে। কোন সময়ে কতগুলো বাস চলবে, বাসগুলো কতদূর এবং কতক্ষণ পর্যন্ত চলবে তা ঠিক করে দেবে কোম্পানি। একইভাবে রাজস্বের সব ঝুঁকি নেবে কোম্পানি নিজেই। এ কারণে বেসরকারি অপারেটর নিজের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় বা বাস পরিচালনা করতে পারবে না। ফলে যাত্রীরা সর্বোচ্চ সেবাই পাবে বলে আমি মনে করি। তবে স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে বিআরটি নির্মাণের যে ধারণা, বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি করিডরের নির্মাণকাজ তার সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না বলে মনে করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষকে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

তার এ মন্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রকল্পের নির্মাণব্যয় ও কাজের অগ্রগতির চিত্রে। গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি। ব্যয় হচ্ছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিআরটির তকমা পেয়েছে এ প্রকল্প।

প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয় ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর। এরপর বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়কে বাসের জন্য বিশেষায়িত লেনের নকশা ও দরপত্র আহ্বানেই পেরিয়ে যায় পাঁচ বছর। ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিআরটি লেন নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ। ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দফায় দফায় বাড়িয়ে বাস্তবায়নকাল এগিয়ে নেয়া হয়েছে আগামী বছর পর্যন্ত। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ডিসেম্বরে চালু হতে যাচ্ছে প্রথম বিআরটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত