প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চিররঞ্জন সরকার : বুদ্ধদেব গুহ বরাবরই প্রকৃতি ও স্থানের বর্ণনা বেশ ভালোভাবে দিতেন

চিররঞ্জন সরকার : শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন সাহিত্যিক বুদ্ধবে গুহ। ৮৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পেশাগত জীবনে একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হলেও তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসে পাঠক পান এক স্বপ্নালু বিমূর্ততা ও রোমান্টিক আবেদন। যা তাঁকে দিয়েছে অসম্ভব জনপ্রিয়তা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে ‘সবিনয় নিবেদন’ পড়ার পর থেকেই বুদ্ধদেব গুহের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এরপর ‘কোয়েলের কাছে পড়ে’ যেন নতুন করে বিভূতিভূষণকে খুঁজে পেয়েছিলাম। বন-জঙ্গল-বৃক্ষরাজির নিখুঁত বর্ণনা ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিলো। বন-জঙ্গল, পাহাড় আর শিকার ছাড়াও বইটিতে আর যে দুইটি বিষয় উঠে এসেছে তা হলো প্রেম এবং প্রতিশোধ। এই বই পড়েই প্রথম সব ছেড়ে ছুঁড়ে পাহাড়ে একটা ছোট্ট ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এরপর বুদ্ধদেব গুহের ভিন্ন স্বাদের গল্প পড়েছিলাম ‘একটু উষ্ণতার জন্য’। গল্পের মূল চরিত্র সুকুমার বোস তার স্ত্রীর কাছে উষ্ণতার ছোঁয়া না পেয়ে, দীর্ঘ শীতার্ত দিবসের পর ছুটি নামক এক উষ্ণতাকে আলিঙ্গন করে বাঁচতে চেয়েছিলেন। যেমনভাবে নয়নতারাকে আলিঙ্গন করে বাঁচতে চেয়েছিলো শৈলেন। লাবুও একটু উষ্ণতার জন্য হাত ধরলো নুড়ানীর, পেছনে ফেলে রাখলো তার শীতার্ত পরিবারকে। সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাইরে আছে লেখকের আকর্ষণীয় প্রকৃতি বর্ণনা। বরাবরই বুদ্ধদেব গুহ প্রকৃতি আর স্থানের বর্ণনা বেশ ভালোভাবে দেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। প্রায় সব মানুষই সারাজীবন এমন কাউকে খুঁজে বেড়ায়, যে কিনা তার খারাপ লাগা সময়ে তার দিকে একটু উষ্ণতার হাত বাড়িয়ে দিবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না। নিজের উষ্ণতার ভার নিজেকেই নিতে হয়, নিজের উষ্ণতার জন্য অন্য কারো কাছে কখনো হাত বাড়াতে নেই। এই কথাটাই যেন ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ উপন্যাসে বুদ্ধদেব গুহ বলেছেন।

এরপর পড়েছি মাধুকরী। মাধুকরী একটি ভিন্ন অনুভব ও অনুভূতির উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র পৃথু ঘোষ চেয়েছিলো, বড় বাঘের মতো বাঁচবে। বড় বাঘের যেমন হতে হয় না কারও উপর নির্ভরশীল না নারী, না সংসার, না গৃহ, না সমাজ- সেভাবেই বাঁচবে সে, স্বরাট, স্বয়ম্ভর হয়ে। তার বন্ধু ছিলো তথাকথিত সভ্য সমাজের অপাঙক্তেয়রা। পৃথু ঘোষ বিশ্বাস করত, এই পৃথিবীতে এক নতুন ধর্মের দিন সমাসন্ন। সে-ধর্মে সমান মান-মর্যাদা এবং সুখ-স্বাধীনতা পাবে প্রতিটি নারী-পুরুষ। বিশ্বাস করতো, এই ছোট্ট জীবনে বাঁচার মতো বাঁচতে হবে প্রতিটি মানুষকে। শুধু প্রশ্বাস নেওয়া আর নিশ্বাস ফেলা বাঁচার সমার্থক নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেভাবে বাঁচা হয়নি। জন্ম থেকে আমৃত্যুকাল অগণিত নারী-পুরুষ-শিশুর হৃদয়ের, শরীরের দোরে-দোরে হাত পেতে ঘুরে-ঘুরে বেঁচে থাকাই মানুষের নিয়তি, আর এই পরিক্রমারই অন্য নাম মাধুকরী। এ উপন্যাসে জীবনের প্রতি আসক্তি ও আসক্তির মধ্যে লুকিয়ে-থাকা বিতৃষ্ণাকে চমকপ্রদ ভঙ্গিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বর্ণনায় এনেছেন সূক্ষ্মতা, কুশলতায় ছোট-বড় প্রতিটি চরিত্রকে দেখিয়েছেন চিরে-চিরে, যে-দক্ষতায় দেশি-বিদেশি অজস্র কবিতার ব্যবহার সে-সবই এক ভিন্নতর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় পাঠককে । বাংলা সাহিত্যে ব্যতিক্রমী সংযোজন মাধুকরী।

কোজাগর উপন্যাসটিও ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিলো। মূল চরিত্র সায়ন মুখার্জী, রাঁচির অপরূপ সুন্দর পালামৌয়ে সরকারি চাকরি করেন। এলাকার সব মানুষের কাছে সে বাঁশবাবু নামে পরিচিত। সায়ন মুখার্জী চাকরির সুবাদে পালামৌ আসলেও পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা এই জায়গাটিকে সে মন থেকেই ভালোবেসেছে। আর ভালোবেসেছে কাঁহার কন্যা তিতলীকে। সে পাখি ভালোবাসে কিন্তু সমস্ত পাখিজগতের তথ্য জেনে নেওয়ার মধ্যে তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাখি দেখে সময় কাটিয়ে দেয়। কবিমনের অনন্ত অতল বোধকে লেখক সায়ন চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কেন সে রাত জেগে বাইরে তাকিয়ে থাকে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসে থাকে, নীরবে কেন একা একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়–এর উত্তর কেউ জানে না, বোঝে না, জানে শুধু একজন কবি-ই। আর তাই হয়তো সে কিছুটা একাকীত্ব বোধ করে। কারণ এর অতল স্পর্শ তিতলি কখনো পায় না। জীবনের জলছবির পাশাপাশি আছে প্রকৃতির অসাধারণ বর্ণনা। পালামৌ- এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য, নিষ্ঠুর নির্জনতা, মহুয়ার সুবাস, প্রকৃতির নির্মমতা, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কষ্টকর জীবনের কথা- সব মিলিয়ে এক আকর্ষণীয় উপন্যাস। এরপর পড়েছি বাবলি, জলছবি, কুমুদিনী, অববাহিকাসহ অনেক বই। পাঠককে আকর্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো বুদ্ধদেব গুহের। হ্যাঁ, তার অনেক লেখাই ‘নিয়তিবাদী’। মানিকের মতো ‘বস্তুবাদী’ নয়। এটাও যেন আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। বিজ্ঞানের অধ্যাপকের হাতে পাথর সম্বলিত আংটি তো আমাদের দেশেরই চিত্র! পরিশেষ বুদ্ধদেব গুহের প্রয়াণে জানাই শোক ও শ্রদ্ধা। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত