প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: যুদ্ধের ইতিহাস মানুষের ইতিহাস নয়

খান আসাদ: যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে একটি ঠাণ্ডা লড়াই ছিল বা আছে। ডানপন্থী রক্ষণশীল নৃতত্ত্ববিদরা মনে করে, সেই অনাদিকাল থেকেই মানুষ যুদ্ধ করে। একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। মানে ‘সহিংসতা’ বা যুদ্ধ মানুষ আদিকাল থেকেই করে আসছে এবং পুরুষেরা বেশি শক্তিশালী বলে, নারীদের প্রতি সহিংসতা করে। পুরুষ মানেই সহিংস।
বিপরীতে, বামপন্থী নৃতত্ত্ববিদরা একেবারেই উল্টো মনে করে। যুদ্ধ বা সহিংসতার বয়স কয়েক হাজার বছরের। দাস সমাজ থেকে শুরু। আদিবাসীরা, বা আদি সাম্যবাদীরা মূলত নিজেদের মধ্যে লড়াই করেনি, প্রকৃতির সাথে লড়াই করেছে (যা যুদ্ধ বলা নির্বুদ্ধিতা) এবং সেটা করতে প্রধানত পরস্পরের ‘সহযোগিতা’ প্রয়োজন হয়েছে। অন্যদিকে, মার্গারেট মীড, খুব পরিষ্কার দেখিয়েছে, আসলে ‘মেয়েলি’ বা ‘পুরুষালী’ কোনো শারীরিক ব্যাপার না, সামাজিকায়নের ব্যাপার। সহিংসতা বা শান্তির আচরণ, সামাজিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব, শরীরের নয়।

আমাদের পূর্বনারীদের কয়েকটি শাখা ছিলো। হোমো ইরেক্টাস, হোমো ফ্লরেসিয়েন্সিস, হোমো লুজনেসিস, হোমো ডেনিসোভা, হোমো নিয়েনড়ার্থালেনসিস (নিয়েন্ডার্থাল) এবং আমরা হোমো সেপিয়েন্স। বেশ পপুলার বই ‘সেপিয়েন্স’ এর ইজরায়েলি লেখক ইউভাল নোয়া হারারি লিখেছেন, ‘মনে হয় যখন হোমোসেপিয়েন্সরা নিয়ান্ডারথালদের সাথে দেখা হয়, তখন ইতিহাসের প্রথম গণহত্যা ঘটে’। মানে, আমরা মানুষেরা আমাদের খালাতো ভাইবোন দের সমূলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ করি। আরেকজন লেখক, জ্যারেড ডিয়ামন্ড ১৯৯৭ সালে লিখেন বিখ্যাত বই ‘গানস জার্মস অ্যান্ড স্টিল’, মনে করেন মানুষেরা দুর্বল প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে খুনিদের শাস্তি দিয়েছে। মানে, নিয়ানডার্থালেরাও খুনিই ছিলো। এরপর, বিখ্যাত নাস্তিক জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স লিখেন যে মানুষের জেনেটিক কোডেই স্বার্থপরতা ‘লেখা’ আছে।

রুটগার ব্রেগমান, তাঁর ‘Human Kind: A Hopeful History’ বইতে যে মোদ্দা কথাটি বলছেন, সেটা হচ্ছে, ইতিহাসে এরকম কোনো এভিডেন্স নাই যে মানুষেরা অন্য মানুষদের মেরেছে। তাহলে নিয়ানডার্থালদের বিলুপ্তি হলো কেন? ব্রেগমান একটি সহজ উত্তর দেয়। সেই ডারউইনের ধারণা, সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। কিন্তু এই সারভাইভালের মন্ত্র কি? ব্রেগমান লিখেন, হোমোসেপিয়েন্সের ‘সহযোগিতা’ ও নিজেদের প্রতি ‘সমানুভূতির’ আবেগ।(বামপন্থীরা বইটি পড়ার সময় দুএক বার বিষম খাবেন, কারণ এক চিমটি সোভিয়েত নিন্দা আছে, যা না থাকলে আমেরিকা ইউরোপে বেস্ট সেলার হওয়া যায় না।) তাহলে যুদ্ধের যে সব প্রমাণ আছে, সেগুলি কি ভুয়া?

যেমন ১৯২০ সালে আবিষ্কৃত হয় আমাদের অনেক অনেক আগের পূর্বনারীর এক সন্তানের হাড়। এর গোত্রের নাম অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস।এই লোকের হাড়ে অনেক অনেক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। গবেষক রেমন্ড ডার্ট ১৯২৪ সালে তাঁর বইতে প্রমাণ করেন, এই হাড় দিয়ে বোঝা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষেরা কতটা সহিংস ছিলো। কী নৃশংসভাবে এই লোকেরে পিটাইয়া পিটাইয়া মারছে! এর পর হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেখা হয়, মানুষ কবে থেকে যুদ্ধবাজ, এই জ্ঞান দানে। ২০০৬ সালে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একমত হন যে, আসলে ওই আঘাত ছিলো বড় কোনো শিকারি পাখির। কোনো মানুষের না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্য যারা নিহত হয়েছে, তা কীভাবে? কেমিক্যালে ২ শতাংশ, বিস্ফোরণে ৩ শতাংশু, ল্যান্ড মাইন ও বুবি ট্র্যাপে ১০ শতাংশ, বুলেটে ও এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন ১০ শতাংশ এবং মর্টার ও বিমান থেকে বোমায় ৭৫ শতাংশ। দুটো বিষয় পরিষ্কার। এক. অধিক হত্যার জন্য দূরে থেকে বোতাম টিপে হত্যার ঘটনা বেশি। দুই. সামনা সামনি মানুষ মারা খুব সহজ নয়, হলিউড সিনেমায় যেমন দেখানো হয়।

প্রতিদিন না খাইয়ে মানুষ মারা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই কেন? কারণ এটি পুঁজিবাদের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। পরোক্ষ, সিস্টেমিক। যেহেতু আমাদের চোখের সামনে, সরাসরি কুপিয়ে হত্যা করা হয় না, আমরা ফেসবুকে পুঁজিবাদের পক্ষে কথা বলতে আসুবিধা বোধ করি না। যেমন দূর থেকে বোতাম টিপে হত্যা করা সহজ। ওয়ার অন্ টেররে, ৭০০০ মার্কিন সৈন্য যুদ্ধে নিহত হয়েছে, আর ৩০০০০ হাজার, মানে চার গুনের বেশি আত্মহত্যা করেছে। সুস্থ মানুষ যুদ্ধ ভালবাসেনা। পুঁজিবাদী মুনাফার প্রয়োজন না হলে মানুষ অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করে দিত।

জ্ঞানের মনস্তত্ত্ব হচ্ছে, বিলিভিং ইজ সিইং। মানে বাস্তবতাকে দেখার সক্ষমতা মতাদর্শ নির্ভর। মানুষ খারাপ বিশ্বাস করলে শুধু খারাপ দেখা যাবে, আর ভালো মনে করলে অনেক ভালো দিক দেখা যাবে। মানুষের হাড়ের আঘাতের চিহ্ন থেকে দুই বিপরীত সিদ্ধান্তে কেন পৌঁছানো হয়েছিলো, ওই বিলিভিং ইজ সিইং এর কারণে। যুদ্ধ শ্রেণীসমাজের উদ্ভবের পরের ঘটনা, এই সেদিনের, ইতিহাসের বিচারে।

আপনার বিশ্বাস ও মতান্ধতাকে অনবরত প্রশ্ন করুন। আপনি যা পড়েছেন, সেটিই জ্ঞানের শেষ কথা নয়। আপনি যা সমর্থন করছেন, তার পেছনের মতাদর্শ খুঁজুন। কারণ আপনার চিন্তা কোনো না কোনো মতাদর্শ প্রভাবিত। ধর্মের নামে, বিজ্ঞানের নামে, পাণ্ডিত্যের নামে, আপনি কি বৈষম্য, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা ও সহিংসতাকে বৈধতা দিচ্ছেন? ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত