প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] আফগানিস্তানের ৮৫ শতাংশ দখলের দাবি তালেবানের

রাশিদুল ইসলাম : [২] অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, মার্কিন সেনা সরে এলে ফের আফগানিস্তান দখল করে নেবে তালেবান। শুক্রবার তালেবান দাবি করল, ইরান সীমান্তে বিস্তীর্ণ অঞ্চলও দখল করে নিয়েছে তারা। সীমান্তের ইসলাম কালা শহরে এখন ঢুকে পড়েছে তালেবান। এর ফলে ইরান থেকে চীন সীমান্ত পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তাদের দখলে এসেছে। দি ওয়াল

[৩] সম্প্রতি মস্কোয় তালেবানের এক প্রতিনিধিদল দাবি করেছে, আফগানিস্তানের ৩৯৮টি জেলার মধ্যে ২৫০টি তাদের দখলে। তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লা মুজাহিদ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরান সীমান্তে ইসলাম কালা শহর তাঁদের দখলে এসেছে। অন্যদিকে কাবুল থেকে আফগান সরকার জানিয়েছে, ওই শহরে এখনও লড়াই চলছে। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তারেক আরিয়ান বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ইসলাম কালা অঞ্চলে মোতায়েন করা আছে। তারা শহরটি ফের দখল করার চেষ্টা করছে।”

[৪] গত শুক্রবারই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করেন, ৩১ আগস্টের মধ্যে তাদের সেনাবাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে আসবে। কারণ তাদের ‘লক্ষ্যপূরণ হয়েছে’। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করে নেন, কাবুল থেকে পুরো আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু তিনি নতুন প্রজন্মের আমেরিকানদের আর আফগানিস্তানে যুদ্ধে পাঠাবেন না।

[৫] গত কয়েক সপ্তাহে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ অঞ্চল তালেবানের দখলে এসেছে। আফগান সরকারের হাতে আছে কয়েকটি শহর। আকাশপথে শহরগুলিতে খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। বাইডেনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, তালেবান কি পুরো আফগানিস্তান দখল করে নেবে? তিনি বলেন, “তেমন সম্ভাবনা কম”। পরে তিনি বলেন, “কোনও ঐক্যবদ্ধ সরকার পুরো আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করবে, এমন সম্ভাবনাও কম।” তালেবান বাইডেনের এই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে।

[৬] আফগানিস্তানে ফের তালেবানের উত্থানে ভারতের সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ মার্কিন সৈন্যের থেকে বিপুল সংখ্যক স্নাইপার রাইফেল, হ্যান্ড হেল্ড রেডার এবং শোল্ডার ফায়ারড মিসাইল কেড়ে নিয়েছে তালেবান। সেই অস্ত্র এবার জম্মু-কাশ্মীরের জঙ্গিদের হাতে আসতে পারে।

[৭] কিছুদিন আগেই কাশ্মীরে জৈশ ই মহম্মদ ও লস্কর ই তৈবার জঙ্গিদের কাছে আমেরিকায় নির্মিত এম ফোর রাইফেল পেয়েছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। তার ওপরে আফগানিস্তানে যদি জেহাদিরা জয়ী হয়, তাহলে কাশ্মীর বাদে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষত উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে জঙ্গিরা তৎপর হয়ে উঠতে পারে।

[৮] আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে বিপদে পড়তে পারে রাশিয়াও। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আর কয়েক মাসের মধ্যে কাবুল দখল করে নিতে পারে তালেবান। কারণ সেক্ষেত্রে মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হবে। তালেবানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ইরানও। কারণ তারা ক্ষমতায় এলে ফের আফগানিস্তান থেকে আসবে উদ্বাস্তু স্রোত। তালেবানের অত্যাচারে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে আসবেন ইরানের জাহেদান অঞ্চলে।

[৯] তালেবান চাইলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে গোটা আফগানিস্তান দখল করতে পারে বলে এই গোষ্ঠীর নেতারা যে দাবি করেছেন তার জবাব দিয়েছে কাবুল। আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘বিদেশিদের তাবেদারি’ বাদ দিয়ে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগানোর জন্য তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

[১০] শুক্রবার মস্কোয় সাংবাদিকরা রাশিয়া সফরকারী তালেবান প্রতিনিধিদলের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বক্তব্য সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় তালেবান প্রতিনিধিদলে প্রধান শেখ শাহাবুদ্দিন দেলোয়ার বলেন, “এটি বাইডেনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি। তবে যে তালেবান মাত্র একদিনে ১৪ জেলার পতন ঘটিয়েছে তারা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে গোটা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার সক্ষমতা রাখে।” তিনি বলেন, তালেবান বিদেশি সেনাদেরকে নিরাপত্তার সঙ্গে আফগানিস্তান ত্যাগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

[১১] এদিকে শাহাবুদ্দিন দেলোয়ারের বক্তব্যকে ‘মনগড়া’ আখ্যায়িত করে আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তারিক অ্যারিয়ান বলেছেন, “তার বক্তব্য আফগানিস্তানের বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।” তিনি বিবিসি ফার্সিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “তালেবানের দাবি যদি শতকরা একভাগও সত্যি হতো তাহলে তাদের নেতারা আফগানিস্তানের বাইরে জীবনযাপন করতেন না।” আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী স্থল ও আকাশপথে তালেবানের যেকোনো হুমকির জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

[১২] তারিক অ্যারিয়ান বলেন, “তালেবান গোষ্ঠী তাদের জঙ্গিদের লাশ [পাকিস্তানের] পাঞ্জাবের গণকবরগুলোতে দাফন করছে।পাঞ্জাবে এখন আর কবর খোঁড়ার মতো স্থান বাকি নেই বলে গণকবরে এসব লাশ চাপা দিতে হচ্ছে।”

[১৩] শাহাবুদ্দিন দেলোয়ারের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার তালেবানের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মস্কো সফরে যান।রুশ সরকারের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে এ সফর অনুষ্ঠিত হয় বলে তালেবান জানিয়েছে। এর আগে বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে। তেহরানে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃআফগান সংলাপে তালেবান প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আফগান সরকারের একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। ওই সংলাপে তালেবান ও আফগান সরকার রাজনৈতিক উপায়ে আফগানিস্তানের চলমান সংকট নিরসন করতে সম্মত হয়।

[১৪] এদিকে রাশিয়া বলেছে, আফগানিস্তানের নতুন নতুন এলাকা দখলকারী তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসা জরুরি হয়ে পড়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ মন্তব্য করে বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। রাশিয়া তলেবানকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ বলে মনে করে।

[১৫] পেসকভ শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, আফগানিস্তানে যা কিছু ঘটছে বিশেষ করে আফগানিস্তান-তাজিকিস্তান সীমান্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তালেবানের সঙ্গে সংলাপ জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে তালেবান গোটা আফগানিস্তান দখল করে ফেললে মস্কো সম্ভাব্য তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেবে কিনা এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি পেসকভ।

[১৬] দিমিত্রি পেসকভ এমন সময় তালেবানের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বললেন যখন তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল মস্কো সফর করছে। তাজিকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর চলমান গোলযোগ নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ দূর করতে তালেবানের একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিদল মস্কো সফরে গেছে। তালেবান হামলার জের ধরে আফগানিস্তানের শত শত সীমান্তরক্ষী ও সাধারণ নাগরিক এরইমধ্যে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে পালিয়ে গেছে।

[১৭] তালেবান প্রতিনিধিদল রাশিয়ার আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জামির কাবুলোভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার মস্কোয় তালেবান প্রতিনিধিদল রাশিয়ার আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জামির কাবুলোভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, ওই সাক্ষাতে তালেবান রাশিয়াকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছে যে, তারা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে না। জাখারোভা শুক্রবার মস্কোয় বলেন, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র তাজিকিস্তানেরর সঙ্গে আফগানিস্তানের সীমান্তের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বর্তমানে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

[১৮] অন্যদিকে রাশিয়া সফরকারী তালেবান কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন দেলোয়ার মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা কোনো অবস্থায় আফগান ভূমিতে আইএসের (দায়েশ) মতো উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে তৎপরতা চালাতে দেবেন না। তিনি বলেন, কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে আফগান ভূমি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত