প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় প্রণোদনা ঋণ পাচ্ছেন না সিনেমা হল মালিকরা

ইমরুল শাহেদ: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস চলচ্চিত্রশিল্পের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ, চলচ্চিত্রের উন্নয়ন এবং এই শিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ বা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবনার শুরুতেই তিনি বলেছেন, ‘বেশ ক’ বছর ধরেই দেশের চলচ্চিত্রশিল্প ও ব্যবসা চরম সংকটজনক একটা কাল অতিক্রম করছে। সিনেমাহলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে মোট চালু হলের সংখ্যা তিন অংকের নিচে এসে নেমেছে। ছবি নির্মাণের সংখ্যাও এক চতুর্থাংশে নেমে গেছে। এর উপর গত দেড় বছর ধরে কোভিড মহামারির আগ্রসনে অন্যান্য যে কোনো শিল্প ও ব্যবসা অঙ্গনের তুলনায় চলচ্চিত্রের সার্বিক অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেটা আদৌ টিকে থাকবে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘চলচ্চিত্রের মানুষগুলো নিজেরা চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়ানোর। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় এফডিসির উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কবিরপুরে বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটিতে নির্মাণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে, প্রতিবছর অনুদানের ছবির সংখ্যা ২০ এর ঘরে এসে পৌঁছেছে এবং অনুদানের অর্থের পরিমাণও ৬০ – ৬৫ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের বর্তমান সিনেমাহলগুলো সংস্কার করে আধুনিকায়ন এবং নতুন সিনেমাহল/সিনেপ্লেক্স তৈরির লক্ষ্যে এক হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঋণ তহবিল গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত সার্কুলারে ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে; একটি সিনেমা হলের সংস্কারে / নির্মাণে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যার সুদ হবে ৪.৫-৫ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ হবে ৮ বছর। এই পুনঃ ব্যবহারযোগ্য তহবিলের বিষয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকলেই আশা করেছিলো, সিনেমাহল মালিকদের মধ্যে ঋণ গ্রহণ করে সিনেমা হল সংস্কার এবং নতুন হল নির্মাণে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি হবে। আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সিনেমা হল/ সিনেপ্লেক্স তৈরি হলে দেশীয় চলচ্চিত্রের ভেঙে পড়া বাজার ব্যবস্থা আবারো দাঁড়িয়ে যাবে। উন্নততর ও আরামদায়ক অবস্থায় ঘরমুখী সিনেমা হলের দর্শককে আবার হলমুখী করবে। পাশাপাশি বাজারটা শক্তিশালী হয়ে গেলে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়বে এবং মেধাসম্পন্ন অভিজ্ঞ নির্মাতারা ব্যবসাসফল ছবি নির্মাণে এগিয়ে আসবেন।

‘কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই তহবিল ঘোষণার কয়েকমাস গত হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য কোনো প্রকল্প প্রস্তাব বা আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা যায় না। এই বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঋণ গ্রহণের এবং ঋণ প্রদানের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কারণটা সরাসরি ব্যাখ্যা করলেন এভাবে যে, প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক সমস্ত তফসিলি ব্যাংগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংগুলোর প্রধান কার্যালয় থেকে নিচের শাখাগুলোর পর্যায়ে এ বিষয়ে নিয়মনীতি ও পদ্ধতি উল্লেখ করে কোনো নির্দেশিকা জারি করা হয়নি। এই বিষয়ে শাখার ব্যবস্থাপকেরা কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় অজ্ঞতা ও অনীহা প্রকাশ করছেন। এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু জুন মাস অর্থবছরের শেষ সময় হওয়ায় তাদের সাথে ভালোভাবে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। প্রদর্শক সমিতি মনে করে এই জটিলতা নিরসনের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ এবং সম্ভাব্য ব্যবহারকারি হিসেবে প্রদর্শক সমিতির প্রতিনিধি নিয়ে একটি সমন্বয় সভা হওয়া প্রয়োজন।

‘দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান সিনেমাহলগুলো কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোর মালিকদের নিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি এই কোভিড – ১৯ এর মধ্যেও কয়েকটি সভা করেছে, তন্মধ্যে বগুড়ায় বেশ বড় একটি সভা হয়েছে। এ বিষয়ে যে প্রশ্নগুলো বেরিয়ে আসছে, তা হলো, দেশে যেসব ছবি নির্মিত হয়, সেগুলি দিয়ে সিনেমাহলগুলির ব্যবসা চালিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না বলেই একে একে সিনেমাহল বন্ধ হতে হতে এখন ৮ শতাংশ হল কোনোরকমে চালু রয়েছে।এগুলিও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

এমতাবস্থায় বিপুল অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে সিনেমাহল আধুনিয়াকয়ন করে যদি একই ধরনের ছবি চালাতে হয়, তাহলে যেখানে হলের দৈনন্দিন খরচ চালিয়ে নেওয়াই কষ্টকর সেখানে, সুদসহ অর্থ ফেরত দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। ঠিক একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করছেন ব্যাংকগুলির স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ঋণ ছাড়াই যেখানে সিনেমাহল টিকে থাকছে না, সেখানে সুদসহ ঋণের অর্থ কিভাবে হল মালিকগণ ফেরত দেবেন। তফসিলি ব্যাংকগুলো হলমালিকদের থেকে ঋণের অর্থ ফেরত না পেলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা কেটে নিয়ে যাবেই। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটালে ঋণের অর্থ ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না কর্মকর্তারা। যে কারণে তারা ঋণের প্রকল্প প্রস্তাব বা আবেদন গ্রহণে নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন।

‘সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো অর্থাৎ সরকারি মালিকানাধীন স্টুডিও এফডিসিকে বিশাল অংকের টাকা দিয়ে আধুনিকায়ন করেছেন। কিন্তু ছবি নির্মাণের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই এফডিসিই এখন বিরানভূমি। ফিল্মসিটি নির্মাণেও প্রচুর টাকা দেওয়া হচ্ছে, অনুদানের ছবির পেছনে যে টাকা যাচ্ছে সেগুলোও ফেরত আসছে না। অথচ সিনেমাহল মালিকেরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ হারের রাজস্ব আদায় করে শত শত কোটি টাকা সরকারের ঘরে জমা দিয়েছে। তাদেরকে কোনো অনুদান তো কোনোকালেই দেওয়া হয়নি, বরং যে ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো, সেটিও বাস্তবায়িত না হবার আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে, একত্রে বসা উচিত বলে মনে করেন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ত¡গণ।’

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত