প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: কে কাপড় পরে না, আর কে জোব্বা পরে, কে কাপড় পরেই না, তা দিয়ে বিচার করবেন না

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: পরীমনিকে রেপ ও হত্যা চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আসামী নাসির ইউ মাহমুদের সঙ্গে কিন্তু আমরা তার ‘তিন রক্ষিতা’কেও ধরেছি। তখন এক সাংবাদিক সাহস করে জিজ্ঞেস করেছেন, তাহলে বসুন্ধরার এমডি আনভীরকে ধরা হয়নি কেন? তখন তিনি উত্তর দিয়েছেন, গুলশান থানা যদি রিকুইজিশন দেয়, তাহলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ধরবো। (সূত্র : আরটিভি) বিষয়টা মজার না? পরীমনির ঘটনা ঘটেছে বোট ক্লাবে, মামলা হইছে সাভারে, সেই আসামী ধরা খাইছে উত্তরায় একদিনের মধ্যে। আর অন্যদিকে আনভীরের ঘটনা ঘটেছে গত মাসে, মিডিয়াজুড়ে ভিক্টিম মুনিয়াকে ব্লেমিং করা হইছে ‘রক্ষিতা’ বলে, কিন্তু এখনো কেউ ধরা খায়নি! বিষয়টা দারুণ না? কাকে ধরা যাবে আর কাকে ধরা যাবে না, কোনটা বলা যাবে আর কোনটা যাবে না- সেটা বুঝতে হলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের নজর রাখলেই হবে! তারা রেপিস্ট টিকটক বাবুর নাম ছাপতে পারে, পরিমলের নাম ছাপতে পারে, কিন্তু মুনিয়ার সম্ভাব্য খুনি আনভীর সোবহান বা পরীমনির সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টাকারী নাসিরউদ্দিনের নাম ছাপতে পাওে না। তখন নামের জায়গায় লেখে ‘দেশের এক শীর্ষস্থানীয় গ্রুপের এমডি’ কিংবা ‘একজন ব্যাবসায়ী’। সংবাদমাধ্যমের এই অবস্থা কি একদিনে হইছে? এই জিনিস বহুদিনের ড্যামেজের ফল। কোন সংবাদ ছাপলে কাটতি বেশি, কোনটা না ছাপলে সুবিধা বেশি- এগুলো সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। এই ভাগ করে নেওয়ার কালচার তখনই শুরু হয়েছে যখন আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে ভাগ হওয়া শুরু করলাম।

যেদিন থেকে নায়িকারে রেপ করার খবর ফ্রন্টে আর ‘রক্ষিতা’ বলে ব্লেম দিয়ে হত্যাকে স্বাভাবিক হিসেবে বলা, টাকা দিয়ে চুপ করায়ে দেওয়া হইলে সমস্যা নেই- এটকে মেনে নেওয়া শুরু করলাম, সেদিন থেকেই খেলা আরম্ভ হইছে। আর এই মিডিয়া ম্যানুপুলেশান খেলায় ধরেই নিছি, আলোচিত কেউ জখম হইলে সেটা রিকশাওয়ালা জখম হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর। অথচ ওই গরিব মেহনতী মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতেই উন্নয়নের বয়ান দেয়া যায়। ভিক্টিম ব্লেমিংয়ে সম্ভবত আমরা দুনিয়ায় অদ্বিতীয়। আমরা নিজেদের জীবনের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছি, মেনে নেওয়া শিখেছি যে আমাদের জনপ্রিয়তা, টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে আমাদের জীবনের দাম নির্ধারণ করা হবে। এই খেলার শেষ দানে এসে আমরা টের পাচ্ছি- আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ হয়ে এমন জায়গায় গেছি যেখানে নায়িকাকে মারার চেষ্টা হইলে একদল এসে জিজ্ঞেস করে ইসলামী বক্তা আবু ত্ব-হার হারিয়ে যাওয়ার কথা, ইসলামী বক্তার কথা কইলে নায়িকার পোশাক, রেপ করার আর মার দেওয়া ইসলামসম্মত কিনা সেটা মাপা শুরু হয়। ভিক্টিম রক্ষিতা কিনা, ইসলামী বক্তা কিনা, রক্ষিতা কিনা, বেশ্যা কিনা’র চেয়ে বড়ো প্রশ্ন হওয়ার কথা- ভিক্টিমের সঙ্গে অন্যায় হইছে কিনা, সে নির্যাতিত কিনা।

ভিক্টিম কবে কার সঙ্গে শুইছে, ক কাপড় পরছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ না করলে পেটের ভাত হজম হয় না? অথচ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হইছিলো সব ধর্মের সব বিশ্বাসের মানুষের জন্য, সংবিধান অনুযায়ী সব মানুষ এখনো সমান। দুনিয়ার সব ভিক্টিমের রক্তের রঙ লাল, যে হারিয়ে গেছে তারও, যাকে রেপ আর হত্যাচেষ্টা হইছে তারও। তাকে জাতপাত দিয়ে, না মেপে একটা কথা নিজেকে বলেন- আজ তাদের একটাই নাম- ভিক্টিম। আজ তাদের একটাই পরিচয়- বিচার প্রার্থী। আমি পরীমনির একটা সিনেমা দেখিনি, ইসলামী বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের একটা বক্তব্যও ঠিকমতো শুনিনি, মুনিয়া, তনু, সাগর রুনিরে পার্সোনালি চিনি না, যে বাবা মেয়ের রেপের বিচার পাবে না জেনে রেলগাড়ির নিচে ঝাঁপ দিয়েছে তাদের কাউকে চিনি না। কিন্তু তাতে তাদের জন্য বিচার চাইতে আমার অসুবিধা হচ্ছে না। আমার শত্রুর সঙ্গে এই জিনিস হইলেও আমি চাইবো সে ন্যায়বিচার পাক। কাজেই, দয়া করে ফোকাস করেন ঠিক জায়গায়। কে কাপড় পরে না, আর কে জোব্বা পরে, কে কাপড় পরেই না, তা দিয়ে বিচার করবেন না। প্রতিটা অন্যায়ের ঘটনায় একে অন্যকে দোষ দিতে দিতে, ভিক্টিম ব্লেমিং করতে করতে প্রতিবার যে অপরাধীদের টিকিও ছুঁতে পারেন না, আরেকটা ঘটনা দিয়ে পুরানটাকে ধামাচাপা দেন, সেইজন্য কি সামান্য লজ্জা আর অনুশোচনাও হয় না আপনার? ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত