প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: ‘গার্ড অব অনার’ দিতে নারী ইউএনও’র বিকল্প খুঁজবো কেন?

দীপক চৌধুরী: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অগ্রযাত্রার বাংলাদেশকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যেই যেনো অনর্থক নানা প্রশ্নের জন্ম দেওয়া হয়। কিছু কিছু ভুল সুপারিশ বা পদক্ষেপের কারণে চারদিকের বড় বড় কাজ, দৃশ্যমান উন্নয়ন ও সৃষ্টিশীলতাকে ম্লান করার অপচেষ্টা হচ্ছে কি না কে বলতে পারে? আরো প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে নারীর অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশে এখন গর্ব করার স্তরে পৌঁছেছে সেখানে স্ববিরোধী সুপারিশ করা হয় কীভাবে? সহযোগিতার বদলে অনেক ক্ষত্রে অবান্তর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্দেশ্যইবা কী- এ প্রশ্নও আজ উঠছে। নারী দিবসে নারী-পুরুষ সমান অধিকারের দাবি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন চলে। বড়বড় সেমিনারও হয়ে থাকে। অনেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ বক্তব্য রাখেন, তুলে ধরেন সমাজের নানান অসংগতি। কিন্তু হঠাৎ করেই যেনো ‘উদ্ভট’ একটি বিষয় উঠে এলো। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তাদের বাদ রাখতে বলা হলো আকষ্মিকভাবেই। কিন্তু কেন? এ ধরনের সুপারিশের কোনো দরকার ছিল কী?

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তাতে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নারী-পুরুষ সবশ্রেণির নেতা-নেত্রীরা। বিস্মিত হওয়ার কথাই তো! যেখানে প্রতি পদে পদে নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে, যেখানে আমাদের সমাজে এখনো নানারকম অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক ফতোয়া দিয়ে একশ্রেণির ‘মোল্লাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলে- সেখানে এমন ধরনের চিন্তা আসে কোত্থেকে? নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাওয়ার সাফল্যের পথে সেখানে এই ধরনের সুপারিশে করা হয় কীভাবে, এই প্রশ্নে সর্বত্র ঝড়। আমাদের পরিচয়, আমাদের ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পাল্টাতে একটি শ্রেণির মানুষ নানাভাবে রাষ্ট্রে-রাজনীতিতে রয়েছে এবং তারা কিন্তু এ ধরনের সুপারিশে খুশি হবে। গত রোববার সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এনিয়ে আলোচনা উঠার পর সরকারের কাছে সুপারিশ রাখা হয়েছে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওদের বিকল্প খুঁজতে হবে।

আমরা সবাই জানি, রাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা কোন লিঙ্গের সেটা বিবেচ্য হতে পারে না। তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানান এটাই রীতি-বিধান। সংবিধানবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণভাবে ভেবেই বলা যায়, কর্মকর্তাদের নারী-পুরুষ বিভেদ টানার এই সুপারিশ পশ্চাৎপদই শুধু নয়, সংবিধানবিরোধীও। শুধু তাই নয়, এমন সুপারিশ প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন নীতির বিরোধী। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় সংশ্লিষ্ট জেলা/উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক বা ইউএনও সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে থাকেন। কফিনে সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। অনেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে নারী কর্মকর্তা রয়েছেন, আর সেখানেই আপত্তি তুলেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কী বিস্ময়কর চিন্তা। যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ, সেই চেতনায়ই আমাদের বর্তমান সরকার সেখানে এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে না।

মহিলারা জানাজায় থাকতে পারেন না একথা মেনে নিয়েই বলছি, সেক্ষেত্রে ‘গার্ড অব অনার’ আগে দিলে সমস্যা কী! সেখানে মহিলা না পুরুষ ইউএনও রয়েছেন এই প্রশ্ন তো আসেই না। যদিও কমিটির এই সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে যাবে, মন্ত্রিসভায় যাবে এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু এমন সুপারিশ করা হয় কীভাবে, এ প্রশ্নতো উঠবেই। কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা থাকার পর এ সুপারিশ যেনো আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। গার্ড অব অনার আর জানাজা তো এক জিনিস নয়! শহীদের রক্তের বিনিময়ে আর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত দিয়ে গড়া আমাদের দেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে নারী-পুরুষ, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছেন বীরেরা। নারী মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, ইজ্জত দিয়েছেন। নারী হলে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারবেন না, মুক্তিযুদ্ধ করতে পারবেন না- ’৭১-এ কী এমন কোনো কথা বলা হয়েছিলো? সুতরাং এদেশ গড়তে নারীদের অবদান রয়েছে, একথা যেনো আমরা কখনো ভুলে না যাই।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত