প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি: অকেজো হওয়ার ঝুঁকিতে গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের রয়েছে দুটি গবেষণা ও চারটি ব্যবহারিক ল্যাব। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ফার্মেসি অনুষদের বিভাগটির ল্যাব কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ার কারণে ল্যাবগুলোর বেশকিছু যন্ত্রপাতি এরই মধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে গবেষণার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি নয়; করোনার দীর্ঘ ছুটিতে শ্রেণীকক্ষের মতো তালা ঝুলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ব্যবহারিক ও গবেষণা ল্যাবের দরজায়। প্রায় একই ধরনের চিত্র অন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনার দীর্ঘ ছুটিতে অনলাইনে পাঠদান কিছুটা এগিয়ে নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ ব্যবহারিক ও গবেষণা ল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে না থাকায় ব্যবহারিক ল্যাবগুলো খোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। শিক্ষকদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণা চালিয়ে নিলেও সিংহভাগ শিক্ষকই করোনার ঝুঁকি এড়াতে গবেষণাগারের কাজ বন্ধ রেখেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় ল্যাবগুলোর অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, গবেষণার কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ও স্যাম্পল মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে কার্যক্ষমতা হারাবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, কভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়ে ল্যাবগুলো বন্ধ রাখা ঠিক হয়নি। পালাক্রমে ল্যাবগুলো ব্যবহারের সুযোগ রাখা দরকার ছিল। বিশ্বের কোনো দেশই করোনার ছুটিতে ল্যাব বন্ধ রাখেনি; বরং কোথাও কোথাও ল্যাবে ব্যস্ততা বেড়েছে। গবেষণাগার ও বিজ্ঞানাগার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ক্ষয়ক্ষতি হবে। অনেক যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যেতে পারে, অনেক যন্ত্রে ফাঙ্গাস জমে যাবে। এমনকি অনেক গবেষণা ফল সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত ল্যাবগুলো দ্রুত খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বিশ্বজুড়েই বিজ্ঞান অনুষদ বিশেষ করে জীববিজ্ঞানের বিভাগগুলোতে গবেষণা কার্যক্রমের হার অনেক বেড়েছে। যদিও এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই গবেষণাগার বন্ধ রাখা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগে তিনটি ব্যবহারিক ও ছয়টি রিসার্চ ল্যাব রয়েছে। এছাড়া উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অধীন প্রতিষ্ঠিত দুটি ল্যাবসহ বেশকিছু ছোট ল্যাব আছে। গত বছরের মার্চের পর থেকে অধিকাংশ দিনই বন্ধ ছিল এসব ল্যাব।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারপারসন অধ্যাপক হুমায়রা আখতার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবগুলো বন্ধ রয়েছে, ফলে কিছু না কিছু সমস্যা তো হবেই। কিছু ম্যাটেরিয়ালস, ইনস্ট্রুমেন্ট, কেমিক্যাল নষ্ট হয়েছে; আর এটা খুবই স্বাভাবিক। কোনো একটি রাসায়নিকের মেয়াদ হয়তো ছয় মাস বা এক বছর। অথচ গত প্রায় দেড় বছর ধরে ল্যাব বন্ধ থাকায় সেটি ব্যবহারই করা হয়নি। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওই রাসায়নিক স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হবে। যদি কোনো কেমিক্যাল পুরোপুরি নষ্ট না-ও হয়, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এর গুণগত মান নষ্ট হবেই। আর গুণগত মান ঠিক না থাকলে সেটা গবেষণাকাজে আর ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া দেখা গেছে, বন্ধের আগে কেউ হয়তো গবেষণাকাজের জন্য কোনো স্যাম্পল ফ্রিজে রেখেছিলেন। দীর্ঘ বন্ধের পর সেগুলো আর ব্যবহার করা যাবে না, নতুন করে সংগ্রহ করা লাগবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন ল্যাব দেখভালের জন্য কারিগরি কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের ল্যাবগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা বায়েজিদ জানান, দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় ইউভি/ভিআইএস স্পেকট্রোমিটার মেশিনটি এর কার্যক্ষমতা হারিয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৭ লাখ টাকা। ল্যাবের ইউপিএস কাজ করছে না। এছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় রোটারি ইভাপোরেটর ও ফ্রিজ ড্রায়ার মেশিনটাও নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কিছু কেমিক্যাল নির্দিষ্ট সময় পর এমনিতেই নষ্ট হয়। আমাদের ল্যাবে এ রকম কেমিক্যালের মধ্যে রয়েছে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড, সোডিয়াম বাই কার্বনেট ইত্যাদি। এসব উপাদান গত বছরের শুরুর দিকে কেনা হয়েছিল। ক্যাম্পাস খোলার পর নতুন করে আবার সব কিনতে হবে। সব মিলিয়ে শুধু এ ল্যাবেই প্রায় ১৫ লাখ টাকার বেশি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পদার্থ নষ্ট হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়েও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ল্যাবই কভিড-১৯ সংক্রান্ত বন্ধে কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির সদ্য সাবেক উপাচার্যের নানা অনিয়মকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ল্যাব কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা গবেষণাগারের অন্যতম শক্তি। তারা যেহেতু আসতে পারছে না সেহেতু গবেষণার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী, লাখ লাখ টাকার আধুনিক গবেষণা যন্ত্রপাতি এক বছরের বেশি অচল অবস্থায় রয়েছে, সেগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানাগারও বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০ হাজারের মতো। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর বিজ্ঞানাগারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও অকেজো হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শঙ্কা প্রকাশ করে সিলেট মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, করোনার কারণে দূর-দূরান্তের শিক্ষকরা বাড়িতে থাকায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। যারা আসেন তারা নিয়মিতভাবে ল্যাব দেখভালের যুযোগ পান না। সব শিক্ষক ল্যাবের বিষয়গুলো বোঝেনও না। তাই দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পদার্থ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত