প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনিস আলমগীর: ভাসানচরের রোহিঙ্গারা

আনিস আলমগীর: ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে দুটি খবর হয়েছে সোমবার, ৩১ মে ২০২১। একদল দালাল মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর থেকে সাগর ঘুরিয়ে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে নামিয়ে দিয়েছে। রবিবার তাদের মীরসরাই উপজেলার নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীর পাশে রেখে যাওয়ার সময় তিন দালাল ও ১০ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ১০ রোহিঙ্গার মধ্যে সাত জন নারী ও তিন জন শিশু। দ্বিতীয় খবরটি হচ্ছে, বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সোমবার সেখানে বিক্ষোভ ও ভাংচুর করেছে। বিবিসি জানায়, প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের দুই জন কর্মকর্তাসহ একটি প্রতিনিধি দল সোমবার নোয়াখালী জেলার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তারা সেখানে পৌঁছানোর পরপরই রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ করে। পরে একপর্যায়ে কিছু ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। বেলা ১১টার দিকে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন দুই জন কর্মকর্তাসহ প্রতিনিধি দলটি ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে সেখানে গিয়েছিলেন। দলটিতে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর কর্মকর্তারা ছিলেন। এই প্রথমবার ইউএনএইচসিআর-এর কোনো প্রতিনিধি দল ভাসানচরে গেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, দলটিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি নামার পরে সেখানে রোহিঙ্গাদের একটি দল মিছিল করে হেলিকপ্টারটির দিকে এগোতে শুরু করে। সে সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ভাসানচরে ওয়্যারহাউজ নামে একটি ভবনের বাইরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। একপর্যায়ে ইটপাটকেল দিয়ে ভবনটির কিছু জানালার কাঁচ ভাঙচুর করা হয়।

দুটি ঘটনাই ইঙ্গিত দেয় রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের সমস্যা আরও ঘনীভূত হতে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ভাসানচরের দিকে নজর দিতে হবে বেশি। সরকার বড় উৎসাহ নিয়ে গত ডিসেম্বর থেকে কয়েক দফায় ১৯ হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে ভাসানচরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্থানান্তর করেছে। এই নিয়ে কূটনৈতিক মহলেও অসন্তোষ ছিলো। কূটনীতিকরা ঘুরে এসে ভালোই সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন কিন্তু ইউএনএইচসিআর কী বলে সেটা নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশি উৎসাহী। তারা এতোদিন সেখানে যায়নি। আবার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভও হলো। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তাদের ভাষ্য গুরুত্ব বহন করে। আবার এটাও অভিযোগ আছে যে ইউএনএইচসিআর কক্সবাজারের বাইরে যেতে চায় না বলে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সরানোর বিপক্ষে ছিলো। রোহিঙ্গা সমস্যাকে বরাবরই তারা জিইয়ে রাখতে চায়। ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের নিয়ে আরও উদ্বেগের কারণ, কয়েকটি দালাল চক্রের সহায়তায় কয়েক দিন ধরেই ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। দালাল চক্রগুলোকে দেখার মতো নজরদারি তাহলে সেখানে অনুপস্থিত রয়েছে। দালাল চক্রগুলোকে শনাক্ত করার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো দরকার ছিলো শুরু থেকে। এখন প্রশ্ন আসছে, কেন ভাসানচরের রোহিঙ্গারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠছে আর কেনই বা তারা বারবার মালয়েশিয়া যেতে চায়। জানা গেছে, জাতিসংঘের যে প্রতিনিধি দলটি ভাসানচরে গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গারা কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। শুধু তাদেরই কথা বলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো। এই ফোকাল পয়েন্ট হচ্ছে ওইসব ব্যক্তি, যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিনিধির মতো সমস্যাগুলোকে পরিদর্শকদের কাছে তুলে ধরেন। রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের অনেকেই যে আর থাকতে চান না, সেখানে তাদের নানাবিধ অসুবিধার পুরো চিত্র ফোকাল পয়েন্টের সদস্যরা তুলে ধরেন না। তাদের বার্তা ঠিকমতো জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছবে না এই আশঙ্কা থেকে তারা চেয়েছিলেন শুধু ফোকাল পয়েন্ট নয়, অন্যদেরও কথা বলতে দেওয়া হোক। কিন্তু কথা বলার সুযোগ না পেয়ে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ উত্তেজিত হয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে।

ফলে স্বাভাবিকভাবে এই ঘটনার কী প্রতিক্রিয়া হবে সেটা ভেবে ওখানে অবস্থানরত বাকি রোহিঙ্গারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। রোহিঙ্গারা কেন ভাসানচরে না থেকে বিদেশে বা কক্সবাজারে ফিরতে চান! কিন্তু সরকার যখন এই ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো, রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছাতেই সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিলো। অবশ্য রোহিঙ্গাদের দাবি, সেখানে নিয়ে যাওয়ার আগে যেসব প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিলো সেগুলোর সব পূরণ করা হয়নি। তাদের মাসিক ভাতা, প্রতিটি পরিবারকে গরু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিলো, যা সবাইকে দেওয়া হয়নি বলে রোহিঙ্গারা দাবি করছেন। সেখানে শিশুদের পড়াশোনার জন্য কোনো স্কুল তৈরি করা হয়নি। তাদের প্রতিমাসের খাওয়ার যে রসদ দেওয়া হয় তা ন্যূনতম। তাদের কক্সবাজারে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো বলে রোহিঙ্গারা দাবি করেছেন। কিন্তু এখন শুধু চরেই তাদের অবস্থান করতে হয়। এরমধ্যে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। খুব নিচু চরটিতে প্রায়শই পানি প্রবেশ করে, যা ঠেকানোর জন্য যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তার একটি ভেঙে গেছে বলেও জানা গেছে। সামনে বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে, কোনো সাইক্লোন তৈরি হলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে- এমন আশঙ্কাও কাজ করছে। এসব আশঙ্কা এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে ফিরে যেতে চান। সে কারণেই ভাসানচর থেকে কিছু রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগগুলো সাংবাদিকদের কাছে খণ্ডন করেননি ভাসানচর প্রকল্পের পরিচালক। সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি না হলে সমাধান নয়। উত্তেজনা কীভাবে কমবে তার দিকে নজর দিতে হবে। শরণার্থীরা যেমন লাগামছাড়া দাবি করতে পারে না, তেমনি শরণার্থীদের নিয়েও হোস্ট কান্ট্রির দায়িত্ব রয়েছে।

মিয়ানমারে এখন সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলন গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেকছে। রোহিঙ্গাদের আদৌ পাঠানো যাবে কিনা সে সংশয় রয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালের নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের আগস্টে দু’দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একজন রোহিঙ্গাও যেতে রাজি হয়নি। মিয়ানমারে আর কোনো নির্যাতন চালানো হবে না, এই মর্মে তারা মিয়ানমার থেকে কোনো আশ্বাস পায়নি। এখন পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে তার কোনো হদিস নেই। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এনজিওগুলো তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিরোধিতা করে আসছে শুরু থেকে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, দুনিয়ার সব দেশে শরণার্থী শিবিরগুলো সীমান্ত এলাকায় হয়ে থাকে। এতে শরণার্থীদের মনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার একটা ঝোঁক থাকে। ভাসানচরে স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ দিলে তারা নিজ দেশে ফেরত যেতে চাইবে না। এনজিওগুলোর যুক্তি যে ঠুনকো সেটা আবারও দেখা গেলো ভাসানচরকে রোহিঙ্গারা বসবাসের জন্য সহজভাবে নিতে না পারার মধ্য দিয়ে। তাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন হয় বাংলাদেশিদের সঙ্গে মিশে যাওয়া, না হয় বিদেশে পাড়ি দেওয়া। সূত্র : বাংলাট্রিবিউন। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত