প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বেড়েছে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে নৃশংসতা

সমকাল: রাজধানীর পল্লবীতে গত ১৬ মে শিশু সন্তানের সামনে প্রকাশ্য সড়কে সাহিনুদ্দিনকে হত্যার নৃশংসতার ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছিল মানুষ। চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল দেশজুড়ে। ওই ঘটনায় সাবেক এক সংসদ সদস্যসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ জন। পুলিশ-র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন দু’জন। তবে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড থামছে না। বাসার ভেতর গলা কেটে হত্যার পর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, খুনের পর দেহ টুকরা টুকরা করে খণ্ডিত অংশ রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখার মতো নৃশংসতাও দেখা যাচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উপাদান কমে যাওয়ায় মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। সমাজে হিংস্রতা বাড়ছে।

তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। একটা সময়ে সমাজের একজনের ভালোতে সবাই আনন্দ পেতেন। নেতিবাচক দিকগুলো সমাজের লোকজন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতেন। এখন সে ব্যবস্থা উঠেই গেছে বলা যায়। টিকে থাকার জন্য পারিবারিক বন্ধনগুলো ছিন্ন হয়ে গেছে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এসব কারণে অনেকের কাছে সামাজিক, পারিবারিক ও সম্পত্তির কারণে প্রতিশোধের স্পৃহাটা নেশা হয়ে ওঠে। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কেউ কেউ হিংস্রতা চালিয়েও আনন্দ উপভোগ করে। এর ফলেই খুনের মতো নিষ্ঠুর ঘটনার পর তাতে আরও চরম নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতা দেখা যায়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক  বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ সময় ধরে বিচার কার্যক্রমের পর শাস্তির অপেক্ষায় না থেকে এসব নৃশংসতার কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। কারণগুলো ধরে ধরে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক-পারিবারিক অস্থিরতা দূর করে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে শেষ দুই সপ্তাহে সংঘটিত ৬টি হত্যাকাণ্ডের ধরন বর্বরতা ও নৃশংসতায় ছড়ায়। গত ১৬ মে পল্লবীতে সাহিনুদ্দিনকে হত্যার পর ২০ মে রাজধানীর দক্ষিণখানে মো. আজাহার নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার পর তার দেহ ছয় টুকরা করা হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নিহত আজাহারের স্ত্রী আসমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে। দু’জনেই আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়- নিজেদের অনৈতিক সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আজাহার। এ জন্যই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

গত ২৯ মে রাতে রাজধানীর কড়াইল এলাকায় নিজ বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অটোরিকশা চালক ময়না মিয়া। এর পর তার দেহ ছয় টুকরা করে মহাখালীর আমতলী, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও বনানী লেকে ফেলে দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার পুলিশ ওই নৃশংস হত্যায় জড়িত হিসেবে তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে। ফাতেমা জানিয়েছে, তার স্বামী ময়না মিয়া তার দেখভাল করত না। উল্টো তার রুজির টাকা নিয়ে নিত। তা ছাড়া আরেকটি বিয়েও করেছে। সেই ক্ষোভ থেকে তাকে হত্যার পর টুকরা টুকরা করে।

৩০ মে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শিহাব উদ্দিন ওরফে বাবু নামে এক ব্যক্তিকে। এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সম্প্রতি গাজীপুর থেকে সুমন মোল্লা নামে এক যুবকের লাশের ছয় টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় সুমনের স্ত্রী আরিফা বেগম ও তার প্রেমিক তনয় সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জনই পুলিশকে বলেছে, তাদের সম্পর্কে সুমন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ জন্যই তাকে খুন করা হয়।

গত সোমবার রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বাসা থেকে চিকিৎসক সাবিরা রহমান লিপির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে হত্যার পর নৃশংসভাবে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় গতকাল বুধবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, পারিবারিক বিষয় নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

এমন বর্বরতা ও নৃশংসতা কেন হচ্ছে- জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। এর ফলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধও বেড়েছে। সম্পত্তিগত কারণ ও প্রযুক্তির কু-প্রভাবেও নৃশংসতা ছড়াচ্ছে।

অধ্যাপক ফারুকের পরামর্শ, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল বিশ্নেষণ করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড হওয়ার আগেই প্রতিরোধের উপায় বের করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপরাধবিজ্ঞানী ড. জিয়া রহমান  বলেন, এসব সহিংস ও নৃশংস ঘটনার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণই বড়। বড় ধরনের ক্ষোভ, নিজের চাহিদা আদায়ে বাধা দেওয়া বা টানা নির্যাতনের কারণে অতি-ক্ষোভে মানুষ সহিংস হয়ে ওঠে। এসব রোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। কমিউনিটি লেভেলে সংহতি বাড়াতে হবে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্নেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক  বলেন, প্রত্যাশা-প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত ঘটলে মানুষ প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠে- এটা স্বাভাবিক। পাওয়া-না পাওয়ার দ্বন্দ্বেও মানুষ আগ্রাসী ও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। সুস্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো কমে গেলে সমাজে এমন হিংস্রতা বাড়বেই। এ জন্য এসব বিষয়ে সবার অবস্থান থেকে নজরদারি করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক মো. সোহেল রানা  বলেন, প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে এসব সহিংস অপরাধ রোধে পুলিশের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, মানুষ এখন সনাতনি বা নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে গেছে। আবার পশ্চিমা সংস্কৃতিতেও পুরোপুরি মিশতে পারেনি। খণ্ডিত সংস্কৃতির প্রভাবে মাঝামাঝি অবস্থায় থেকে চলমান সামাজিক বাস্তবতায় মানুষ তার অবৈধ সম্পর্কগুলো প্রকাশ করতে পারে না। সেই সম্পর্কগুলো নির্বিঘ্ন করতেই খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চলমান করোনা মহামারির সময়ে মানুষের আয়ের পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়ে গেছে। এক পক্ষ সম্পদ হারানোর ভয়ে থাকলেও অন্য পক্ষ সম্পদ ধরে রাখতে আগ্রাসী হয়ে উঠছে। এসব অসহিষ্ণু মনোভাবের প্রভাব প্রকাশ পাচ্ছে নৃশংসতায়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত