প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পারমিতা হিম: ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ইহুদি নিধনকারী হিটলারকে সমর্থন করার মতো ভুল করবেন না

পারমিতা হিম: জেরুজালেমে এগারোদিনে যা ঘটলো, তা অবশ্যই অন্যায় ও দুঃখজনক। তবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ইহুদি নিধনকারী হিটলারকে সমর্থন করার মতো ভুল করবেন না। হিটলার কুখ্যাত, বিখ্যাত না।  কোনো মানুষকেই তার ধর্মের জন্য মেরে ফেলা বা ঘৃণা করা যায় না। সে হোক ইহুদি, হোক মুসলমান। ভারতে আমার বেশ কিছু আত্মীয় থাকে। তাদের কেউ কেউ আমাকে বলে যে মুসলমানরা খুব খারাপ। তারা হিন্দুদের জোর করে কিংবা ছল করে গরুর মাংস খেতে বলে আর কলেমা পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলে। অন্যদের প্রতি তাদের কোনো রেসপেক্ট নেই। অথচ আমার বাড়ি চট্টগ্রামের যেখানে সেখানে বামপাশের বাসায় থাকতো তাবলীগের বড় হুজুর (আমরা বড় হুজুর নামেই ডাকি), ডানপাশে ফারুকের বাবা যিনি ভান্ডারী (মাইজভান্ডারীর অনুসারী) আর গলির শেষ মাথায় থাকতেন আন্ধা হুজুর।

প্রত্যেক কোরবানির ঈদে আমাদের বাসায় একটা জবাই করা মুরগি আসতো বড় হুজুরের বাসা থেকে। এমন কোনো ভালো খাবার (পোলাও-কোরমা-বিরিয়ানি) নেই যেটা ওই বাসায় রান্না হয় আর এ বাসায় আসে না। ভান্ডারিদের বাসায় কোনো কোনো সন্ধ্যায় হতো জিকির। বেশ কয়েকজন মিলে খাটের ওপরে বসে আল্লাহু-আল্লাহু করতো, তবে আমার প্রিয় সন্ধ্যা সেগুলো যখন উঠানে শামিয়ানা টাঙায়ে গান হতো। আমার হারমোনিয়াম নিয়ে যেতো তারা। বড় শিল্পী (শিমুল শীল, তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন চট্টগ্রামে) আসতো, গান ধরতো ‘কী দিলা আল্লা তুমি আনোয়ারা থানাতে…’ আমার দাদুর বাড়ি আনোয়ারা। আমি সত্যি ভাবতাম আনোয়ারা থানায় নিশ্চয়ই আল্লা দারুণ কোনো ব্যাপার ঘটাইছে।

দুপুরে যেতাম আন্ধা হুজুরের দোকানে। গোল্লা আচার কিনতে। বিকেল হলে দোকানের পাশে মক্তবে আন্ধা হুজুর ছেলেদের আরবি পড়াতেন। আমিও পড়তাম। আর যারা যারা পড়া চোর তাদের বেত দিয়ে মারতাম। হুজুর তো চোখে দেখে না তাই আমি তার সেকেন্ড ইন কমান্ড। হুজুর আমাকে আলিফ বা তা সা শিখিয়েছেন, কোনোদিন বলেননি মুসলমান হয়ে যাও। আমি ছিলাম তার ডান হাত। তিনি কারও বাড়িতে মিলাদ পড়াতে গেলে আমি তাকে হাত ধরে নিয়ে যেতাম। গিয়ে মোনাজাতও ধরতা- ইয়া নবী সালাম আলাইকা। বড় হুজুর আমাকে দেখলে হাসতেন। আর বলতেন, কী যে দুষ্ট মেয়েটা। আমি কখনো তাদের কাছে আলাদা আচরণ পাইনি।

তবে একেবারেই যে কিছু ঘটেনি তাও না। এই যেমন একটা ঘটনা এমন বিব্রতকর যে মনে পড়লে এখনো কষ্ট লাগে। আমার পিসীর কলোনিতে এক বৌদ্ধ পরিবার থাকতো যাদের বাসায় আমি প্রায় যেতাম বই আনতে। ওই কলোনিরই কয়েকজন ছেলে এসে খেলার সময় আমাকে বললো, তুই যে ওই বাসায় যাস, জানিস না বৌদ্ধরা মরা মুরগি খায়। আমি কিছুই বুঝিনি। মানে মরা মুরগি খাওয়া যে কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবু তাদের অস্বাভাবিক টোনে প্রভাবিত হয়ে পরদিন ওই বাসাতে মুরগি দিয়ে ভাত খেতে খেতে তাদের মা, ছেলে সবার সামনে বলে বসলাম, আচ্ছা, তোমরা নাকি মরা মুরগি খাও?  ছেলেরা একজন আরেকজনের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো। মায়ের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো।

আর ছেলেদের একজন বললো, ওহ্, আর তোমরা খাওয়ার সময় বুঝি মুরগিগুলো কক্ কক্ করে ডেকে উঠে? সেই যে একটা লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার অনুভূতি সেটা এখনো হয়, যখনই এ ঘটনা মনে পড়ে, এমনকি এটা এখানে লেখার সময়ও, একইরকম লজ্জাবোধ, এখনও। ধর্ম জিনিসটা সেইদিন থেকে আমাকে ভাবায়। সৃষ্টিকর্তা যদি এক ধর্মের মানুষই চাইতো তাহলে সেইটাই হতো। ইহুদি-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সবার বাচ্চা হতো না। কোনো একটা ধর্ম আপনা আপনিই গায়েব হয়ে যেতো। দুনিয়াতে ৪৩০০ এর বেশি ধর্ম আছে। সেটা ঈশ্বরের ইচ্ছে বলেই আছে। যেইটা আল্লাহ চায়নি সেটা মানুষ কীভাবে চায়? ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত