প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তানভীর তারেক: সম্প্রীতিই হোক শক্তি

তানভীর তারেক: বাড়ি পালিয়ে অণিমা আর আমি কলকাতা আশ্রয় নিলাম। আশ্রয় মানে গানের রেকর্ডিং এর উসিলায় ঘুরতে যাওয়া। সমাজে মেয়েদেরই বেশি বাড়ি পালাতে হয়। সিনেমায় ছেলেদেরকেও অবশ্য দেখা যায় পালাতে। কিন্তু বাস্তবে সেই সংখ্যা খুব কম! ঠিক আমার পালাতে হয়নি। অনিমার একার লড়াই-ই ছিল।
বাড়ি পালাতে হয় কারন ওরা এক শৃঙ্খলে বাঁধা থাকে। এরপর আরেক শৃঙ্খলে যায়। যেন ওদের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখাটা খুব জরুরী। পুরুষদের মতো স্বার্থপর জাত আর কোনো প্রানী নেই! বিয়েটাও একসময় মেয়েদের শেকল হয়ে যায়।
বিভিন্ন শোতে – অনেকের সাথে বকবক করি বলে টের পাই। বেশিরভাগ তারকারা বিয়ের পর শৃঙ্খলে থেকে এই মিডিয়া ছেড়ে দেয়, নয়ত স্বামীকে। দুটোকে সঙ্গে রেখে চলা যেন মুশকিল! বেশিরভাগ অর্থে বলছি।
এরভেতরে কেউ কেউ বিবাহের পর আগের শোবিজ জীবন খুব খ্রাপ। খুব ভুল করেছি। এসব বলে ফ্যানা তুলে দেয়।
এসব ভন্ডামির প্রতিবাদ করি আমি বরাবরই। কারণ প্রতিটি কাজেই সততা ও অসততা বিদ্যমান। এখন তুমি মিডিয়ায় কাজ করে ফেম, টাকা পয়সা সব গুছিয়েছ। কিন্তু হঠাৎ কোনো এক আড়মোড়া সকালে ভোলবদল! অথচ ভোলবদল হলেও সেই কামানো টাকা, ফ্ল্যাট, পপুলারিটি তুমি ফেলে দিচ্ছো না।
যাই হোক .. এক প্রসঙ্গে থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি। সবটাই যার যার ব্যক্তিজীবন। এইগুলিও আমার ব্যক্তিমত। কেউ বিশ্বাস করলে করবেন ; না করলে করবেন না।
কিন্তু সমস্যা হলো সমাজের কিছু অপদার্থ কীট আপনাকে ব্যক্তিমত নিয়েও থাকতে দেবে না। সম্প্রতি আমার ভীষণ প্রিয় অভিনেতা / ব্যক্তিমানুষ চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে প্রত্যেকের সহমত হ্যাশট্যাগ দেখে ভাল লাগলো।
কারণ আমার আর অণিমার বিয়ের পর সামাজিক সংগ্রামটা আরো কঠিন। এটা কাউকে বলে বুঝানো যাবে না।
তাই এগুলোর কোনোটাই আমি কোনোদিন ফেসবুকে প্রকাশ করিনি। কারও সহমতও চাইনি। কারণ অনেক প্রগতিশীল মিডিয়া কর্মী/শিল্পীকেও দেখেছি বাইরে খুব উদার মনস্ক বুলি আউড়াচ্ছে একাধিক আড্ডা বা টকশোতে। কিন্তু দেখা হলে বলছে ‘তুমি তো মিয়া বড্ড ভুল কইরা ফেললা। তোমার পরকালের কথা ভেবে আফসোস হয়!’
এরকম আমার পরকালের জন্য টেনশনে আছে বেশ কজন !!
এক হঠাৎ জনপ্রিয় হওয়া কন্ঠশিল্পী আমার বিয়ের কার্ডে কেন প্রজাপতির ছবি ছিল -তা নিয়ে তার যে কী আপত্তি। অথচ সেখানে কোনো ধর্মের সিম্বল নেই ! সেটা ভেবেও রাখা হয়নি।
অনেকে বিয়ের পর আমাকে বেশি বেশি বিফ খাওয়াতে চায়।
পরীক্ষা করে আমি ঠিক ঠাক আছি কী না।
আমরা এভাবে পানি-জল, খাশী-গরু , তুলশী-নিমগাছ সহ জড় পদার্থকেও দুই ধর্মে বিভক্ত করে রেখেছি। তর্ক বাড়ানোর সুবিধার্থে।
যাক সেসব কথা। শুধু এটুকু বলতে পারি। এই ১১ বছর পার করে ১২ বছরে পা দেয়া আমাদের টোনাটুনির সংসারে কটুক্তি, হুমকি, বাঁকা কথা, অভিশাপ থেকে শুরু করে যা যা শুনেছি এবং শুনছি তা নিয়ে মহাগ্রন্থ হতে পারে। সেগুলে লিখতে বসিনি আজ।
গতকাল ছিল আমাদের বিবাহবার্ষিকী। মনে পড়ে আমাদের বিয়ের ছোট্ট অনুষ্ঠান যেদিন হয়। সেদিন আমার পিতৃতুল্য স্যার আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দৈনিক ইত্তেফাকের ফ্রন্ট পেজে ৫ কলাম লীড ছেপেছিলেন ‘বিষয় ছিল সেক্যুলারিজম। প্রতিবেদন আঙ্গিকে ছিল রিপোর্ট টা। কিন্তু অনেক কথা বলা ছিল সেখানে। পরে জেনেছি। আমার বিয়ের কার্ড দেবার পরেই স্যার ঐ তারিখেই এই রিপোর্টটি করতে বলেন। রিপোর্টের মূল মটো ছিল ‘সম্পর্ক ও সম্প্রীতি।’ এই মানুষটার প্রতি আমার এক মহাসাগর ঋণ।
যাক বেশি কথা বাড়াবোনা। বাড়ালেই মুশকিল। কোন কথা কোন শব্দের ভুল ধরে কে কোনদিক দিয়ে ফতোয়া মেরে দেয়..
কিন্তু যে কথা কোনোদিন বলা হয়নি, লেখা হয়নি , তা হলো-
আমার প্রতিটি রমজানে যে মেয়েটি রাত ২ টায় অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গরম ভাত-তরকারি রেঁধে টেবিলে বসে থাকে , আমি সেহরী খাবো বলে। সে মেয়েটির নাম অণিমা রায়।
আমার ইফতারিতে প্রতিদিন কী কী বৈচিত্র আনা যায়, এসব চিন্তা করে সুন্দর করে সাজিয়ে রাঁধে যে মেয়েটি। ওর নামই অণিমা।
অতিমারির আগে- প্রতি রমজানে এক বা দুটি ইফতারি দাওয়াতে আমার একাধিক বন্ধুকে ডাকি। সেখানে কমপক্ষে ১৫/২০ জন থাকেন। সকল আয়োজন খুব হাসিমুখে যে মেয়েটি সব ব্যবস্থা করে দেয় ওর নাম অণিমা।
আমার ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয়না। কিন্তু রমজান ছাড়াও প্রতিদিন ২/৩ ওয়াক্ত পড়ি। [ ক্ষমা করবেন] ।আমার জায়নামাজটিও ধুয়ে, গুছিয়ে রাখে অণিমা-ই।
সংসারের মাত্র দু একটা দিক লিখলাম। সামান্য কিছু লিখলাম। এর বাইরে গড়ে ঝগড়া, মান অভিমান খুট খাট প্রচুর চলছে চলবে।
মাত্র ক’মাস আগে আমি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে।
কেউ ছিল না পাশে। দেখাও করতে আসেনি অনেকে নিজেদের সেফটির জন্য।
এই অণিমা’ই দিন রাত পাশে থেকে কয়েকটা দিন টানা ঘুমহীন থেকে থেকেছে। আসলে এমন হাজারটা অনুসঙ্গেই এক একটি যুগল জীবন। একেকটি সংসারের গল্প।
আর আমাদের মতো তথাকথিত প্রথাভাঙা এই যুগল জীবনে যেমন শত্রু বেশি, কটাক্ষ করার মানুষ বেশি তেমনি নিবিঢ় বন্ধুও পেয়েছি অনেক। তাদের নিয়েই আমরা সুখে আছি।
অনেকেই আলটিমেটাম দিয়েছিলেন ২/৩ বছর টিকবে। তারাও ৫ বছর পর আমার বাসায় দাওয়াত খেয়েছে! আশীর্বাদ করেছে হয়ত আরো ২ বছরের জন্য। আরো খাওয়াতে চাই। সম্প্রীতিই হোক শক্তি।
সহমর্মিতা, সহনশীলতা, অন্যের ভালতে মুগ্ধ হওয়া এভাবেই কাটাই না এক জীবন। জীবন বড়ই ছোট। পাপ পূন্য পৃথিবীতে বিদ্যমান ৪২০০ ধর্মেই ঐ একই কথা লেখা।
তাই মানুষ হয়ে মানুষকেই ভালবেসে থাকি।
দোয়া রাখবেন আমাদের জন্য। যেন আমিই আগে মরতে পারি! ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত