প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: সমাজবিজ্ঞান দিয়ে সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদীদের বোঝার চেষ্টা করুন

খান আসাদ: হেফাজতে ইসলাম একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সাম্রদায়িক মৌলবাদী জঙ্গিবাদের জাতীয় প্রকাশ্য নেটওয়ার্ক, যারা গোপন জঙ্গিসংগঠনের সাথেও যুক্ত। এদেশে সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিকাশের সাথে অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, একটি ধর্মজীবী শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তারা মূলত রাজাকার আলবদরদের রাজনীতির উত্তরাধিকার ছাত্রশিবিরের পরম্পরায়। সম্মিলন ঘটেছে অন্যান্য র‌্যাডিক্যাল মৌলবাদী ধারার সাথে। তারা রাষ্ট্র প্রশাসনের প্রত্যক্ষ পৃষ্টপোষকতায় ও প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের জোটবদ্ধতা ও প্রশ্রয়ে বিকশিত হয়েছে। তাদের বিকাশের একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। ধর্মজীবী শ্রেণির বিকাশ বাংলাদেশে লুটেরা পুঁজির বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের পুঁজিবাদ পুঁজিসঞ্চয়ের আদিম পর্যায়, ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত লুটেরা পুঁজিবাদ। এই লুটেরা পুঁজির অনুষঙ্গ ধর্মজীবী শ্রেণির সম্পদ আহরণের প্রক্রিয়াও। ধর্মসেবা বিক্রয়, যেমন মাদ্রাসাশিক্ষা, ওয়াজ ও নানা ধরনের ইসলামী প্রোডাক্ট বিক্রি করার মধ্য দিয়ে তারা সেবাখাতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান করে নিয়েছে। এখন তারা নিজেরাই একটি প্রতিযোগী শক্তি, লুটেরা ধনী শ্রেণির। ধর্মসেবার চাহিদা কেন? ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয়ের যে লুটেরা অর্থনীতি, এর অভিঘাতে বাঙালি মধ্যবিত্তের পারিবারিক, সামাজিক ও যৌন জীবনে প্রথাগত নৈতিক মূল্যবোধের উপর আঘাত করেছে। বিকৃত লুটেরা পুঁজিবাদের ফলে যে নৈতিক ও মানসিক সংকট তৈরি করেছে, এই মানসিক সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য, হাতের নাগালে ছিল ধর্মের নীতিকথা।

খেয়াল করে দেখবেন, ঘুষখোর, পাড়ার মাস্তান ও অসৎব্যবসায়ীরা দল বেঁধে হজ্বে যায়। কারণ দুর্নীতির পাপবোধ থেকে মুক্তি পেতে চায়। একই ভাবে, সবচেয়ে লম্পট ছেলেটিও ফেসবুকে ইসলামের বাণী আওড়ায়। মুনিয়ার হত্যার জন্য অভিযুক্ত বসুন্ধরার ভূমিদস্যুর ছেলেটিও ধর্ম নিয়ে বিশাল পোস্ট দেয়। কিংবা মামুনুলের মতো লম্পটেরা ইসলামের ‘হেফাজতে’ নিয়োজিত। লুটেরা পুঁজি মাদ্রাসা মসজিদে দান খয়রাত করে, ধর্মজীবীদের পুঁজি বিকাশে ও সামাজিক আধিপত্য বিকাশে ভূমিকা রাখে। তার মানে, ধর্মজীবী শ্রেণির বিকাশের একটি মনস্তাত্বিবক বা সাংস্কৃতিক বাস্তবতা রয়েছে। …ধর্মকে যেভাবে দেখেছেন, ‘ধর্ম নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস’ তা বাংলাদেশের চলমান প্রেক্ষিতে কিছুটা ভিন্ন। অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বের দীর্ঘশ্বাস রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে, ধর্ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতির নৈতিক পতন থেকে ঐশ্বরিক পরিত্রাণের প্রধান উপায়। ধর্মের এই মনস্তাত্বিক প্রয়োজন থেকে ধর্ম্যাচার ও ধর্মীয় প্রতীক যেমন হিজাব ও টুপির ব্যবহার, কথায় কথায় আলহামদুলিল্লাহ্ ইত্যাদির বেড়ে যাওয়া। এর সাথে আছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলে আসা মর‘সংস্কৃতির প্রভাব ও সৌদি-পাকিস্তানী পোশাকবাণিজ্য। ধর্মসেবা ও ধর্মপ্রোডাক্টের চাহিদা ও যোগান দুটোই বেড়েছে। তবে সমকালীন বাংলাদেশে, সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ জঙ্গিবাদ যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতি করছে, সেটির বিকাশে প্রধান ভূমিকা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের।

এটির সূচনা আফগানিস্তানে মার্কিন ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথা সিআইএ এবং আইএসআই এর সমাজতন্ত্র বিরোধী ভূমিকার কারণে, ঠাণ্ডাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘সোভিয়েত’ বিরোধী প্রোপাগান্ডা ও মৌলবাদীদের সামরিক সহায়তার মাধ্যমে। এরপর, ‘ওয়ার অন্ টেররের’ ফরেন পলিসি, মৌলবাদী জঙ্গিবাদকে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছে, অনেক মুসলমানের কাছে তারাই ‘ইহুদী-নাছারার’ প্রতিপক্ষ। হেফ-জামায়াতি রাজনৈতিক শক্তি অনেক অপ্রত্যাশিত সহায়তাও পেয়েছে, নানা দিক থেকে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ থেকে পেয়েছে, জোট, জমি, ‘জবানের স্বাধীনতা’ তথা ওয়াজের মনোপলি ব্যাবসা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা। যা মূলত বাঙালি সেক্যুলার জাতীয় সংস্কৃতি ধ্বংসের কাজে লাগিয়েছে। অন্যদিকে (অপ) ‘চিন্তা’ গোষ্ঠী তাদের সাবল্টার্ন, ‘মজলুম’ ইত্যাদি আখ্যায়িত করে, তাদের সম্পর্কে যে বয়ান তৈরি করেছে, তা তরুণ প্রগতিশীলদের একাংশকে বিভ্রান্ত করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা সামরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী ইসলামী জঙ্গিবাদ দমনে।

কিন্তু লুটেরা অর্থনীতি যে নৈতিক সংকট জন্মদেয়, ফলে মানুষ যে ঐশ্বরিক পরিত্রাণের প্রত্যাশা করে ধর্মাচারে, এই মনস্তত্বব খুব ভয়ংকর। যা ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি যোগায়। ফলে, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ জঙ্গিবাদের সমস্যা কেবল ‘ল এন্ড অর্ডার’ এর নয়, এবং শুধু আইনি বা সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। ২০১৩ সালের ৬ মে ‘র’হানি রাষ্ট্রপতি’ বাধ্য হয়েছে হাটহাজারী ফিরে যেতে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা মরে যায়নি। ধর্মান্ধতা ও সহিংসতা যদি একসাথে যুক্ত হয়, তাহলে কি ঘটাতে পারে, তা ১৯৪৬, ১৯৭১ এবং সম্প্রতি ২০২১ সালের ২৬ মার্চ আমরা দেখেছি। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী, জঙ্গিবাদের তথা হেফ-জামায়াতি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের চরিত্র আগে জানুন। তাদের উত্থানের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণ খুঁজুন। এই শক্তির বিকাশে সহায়ক জাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের ভূমিকা বুঝুন। কাউকে দোষারোপ করে, ধর্ম ‘ভুল’ জ্ঞানদান করে, তাদের এড়িয়ে গিয়ে বা আড়াল করে, প্রগতির পথে এগোনো যাবে না। সমাজবিজ্ঞান দিয়ে তাদের বোঝার চেষ্টা করুন। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত