প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে চালের মূল্যস্ফীতি

নিউজ ডেস্ক: উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একই সঙ্গে কমেছে সরকারি মজুদ। সরকারি চাল সংগ্রহ কার্যক্রমও লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন ব্যবসায়ীরাও। বিভিন্ন উৎসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে পুরোটা সময় ধরেই অব্যাহত মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে চালের বাজার। বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও।

তারা বলছেন, দেশের জনসাধারণের আয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে মহামারী। এর মধ্যেই প্রধানতম খাদ্যপণ্যের এ বাজার পরিস্থিতি সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় ও বিপদ—দুটোই বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তা হুমকিতে ফেলে দিচ্ছে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকেও। বিষয়টিকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সামনের দিনগুলোয় তা আরো বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

দেশে কভিডের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় গত বছরের মার্চে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ওই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে চালের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। পরের মাসেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে। ডিসেম্বরের শেষে এ মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশে। এর মধ্যে অক্টোবরে তা ২২ দশমিক ৬ শতাংশেও উঠেছে। যদিও মার্চ থেকে ডিসেম্বর—এ দশ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ওঠানামা করেছে ৫ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে। এ ধারা বজায় রয়েছে চলতি বছরেও। মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, এখনো দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখিতায় বড় অবদান রাখছে চালসহ খাদ্যপণ্যের অব্যাহত দরবৃদ্ধি।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বাজার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর বাজারে মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৩-৪৮ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে মাঝারি ও ভালো মানের চালের দাম ছিল ৫৫-৬০ টাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৪৬-৫২ টাকায়। অন্যদিকে মাঝারি ও ভালো মানের সমপরিমাণ চাল বিক্রি হয়েছে ৬০-৬৫ টাকায়। এ সময়ের মধ্যে মান ও ধরনভেদে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩-৫ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে সরকারের মজুদ কমতে থাকায় চালের মূল্যস্ফীতিও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত মাসের শেষ নাগাদ চালের সরকারি মজুদ নেমে এসেছিল তিন লাখ টনের নিচে।

 

চালের এ উচ্চমূল্যস্ফীতি জনদুর্ভোগ বাড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর। চালের মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। আর কভিডকালে এ মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব অনেকটা দ্বিমাত্রিক। সরকারের দুর্বল মজুদ ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা এর সুযোগ নিয়েছে। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে চালের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে হবে। সেটি করতে না পারলে সামনে এ মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে মানুষের দুর্গতিও। এ থেকে উত্তরণে আগামী বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের বাজারে এ উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণ সরবরাহ সংকট ও অব্যবস্থাপনা। উৎপাদন ও সরকারি মজুদ হ্রাসের সুযোগ নিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়েছে। আবার সরকারের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কার্যক্রমও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে দুবার। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত বোরো ও আমন মৌসুমে উৎপাদন কমেছে। এছাড়া ব্যবসায়ী ও মিলারদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। উল্টো তারা ঘোষণা দিয়েও চাল সরবরাহ করেনি সরকারকে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের বোরো মৌসুমে কৃষক ও অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্য অর্ধেকও পূরণ হয়নি। অন্যদিকে গত আমন মৌসুমে সাড়ে আট লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে চাল আকারে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন। এ দুই মৌসুমের সংগ্রহ ব্যর্থতা চালের বাজার অস্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে।

পণ্যটির বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে বলে মনে করছেন সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল। তিনি বলেন, এর মধ্যে একটি হলো চাল উৎপাদনের তথ্যে ব্যাপক অস্পষ্টতা। অন্যটি সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ না করা। এর কারণে আমদানির সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের দুর্বলতা ও অদক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। যখন চাল আমদানির প্রয়োজন ছিল, সে সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়নি। আবার সরকারের মজুদ কোনোভাবেই একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে রাখা যৌক্তিক নয়। যৌক্তিক সীমার নিচে নামলেই মিলার ও চাল ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনারও বহুমুখী প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণার তথ্য বলছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে চালের ভোগ কমিয়ে দেয় ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবার। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৬৬ শতাংশ। দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের বাইরে মধ্যবিত্তকেও ব্যাপক চাপে ফেলে দেয় খাদ্যের মূল্যস্ফীতি। এ শ্রেণীর প্রায় ২৪ শতাংশ পরিবার চালের ভোগ কমিয়ে দেয়। পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খেতে হয় তাদের। খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ে পিছিয়ে পড়ে তারা। দরিদ্র বা অতিদরিদ্র শ্রেণীর পরিবারগুলো তাদের উপার্জনের ৫০-৭০ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্যের পেছনে। এর মধ্যে সিংহভাগই চলে যায় চাল কেনায়। ফলে চালের দাম বাড়লে বাধ্য হয়ে এ শ্রেণীর মানুষ ভোগ কমিয়ে দেয়। এর প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদায়। এতে একদিকে পুষ্টিহীনতায় ভোগা পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যায়, তেমনি দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনাও দুষ্কর হয়ে ওঠে।

সরকার বর্তমানে আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, চালের দামে স্থিতিশীলতা ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে গত বছরের ১৩ জুলাই সরকারিভাবে চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। এছাড়া গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর চালের আমদানি শুল্কে বড় ধরনের ছাড়েরও ঘোষণা দেয়া হয়। ওই সময় ব্যক্তি খাতের চাল আমদানিতে শুল্কহার সাড়ে ৬২ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা হয় ২৫ শতাংশে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট চাল আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ১৭ হাজার ৯৩০ টন। এর মধ্যে সরকারিভাবে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ টন ও বেসরকারিভাবে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ টন।

নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রকৃত উৎপাদন তথ্য সময়মতো হাতে পাওয়া জরুরি। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরই অনেকটাই নির্ভর করে পণ্যের মূল্যস্ফীতি। সেখানে প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য সবার আগে প্রয়োজন। চালের প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু সে প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। উৎপাদন কম হতেই পারে। তাই বলে ১৭ কোটি ভোক্তার জন্য আমদানিতে রক্ষণশীল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই সহনীয় রাখা সম্ভব হতো। তবে চলতি বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে চালের দাম খুব দ্রুতই কমে আসবে বলে ধারণা করছি।

একই বক্তব্য খাদ্য মন্ত্রণালয়েরও। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, গত বছরের মাঝামাঝি বলা হয়েছিল, খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে। সে তথ্যের কারণে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেরি হয়েছে। উৎপাদনের তথ্যটি সঠিক সময়ে সঠিকভাবে জানা গেলে দক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হতো। এছাড়া চাল আমদানির ক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও এনবিআর, কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও জড়িত থাকে। – বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত