প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিটুমিন আমদানিকারকরা বেপরোয়া: বিএসটিআই বুয়েট বিপিসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি

ডেস্ক রিপোর্ট : উন্নয়নকাজ শেষ হতে না হতেই দেবে গিয়েছিল নওগাঁ-বদলগাছী-পত্নীতলা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেশির ভাগ অংশ। কোথাও কোথাও ঢেউয়ের মতো হয়ে গিয়েছিল, যা প্রকৌশলীদের ভাষায় ‘আন্ডুলেশন’। বছর না ঘুরতেই জলে গিয়েছিল ৬৫ কোটি টাকার এই উন্নয়নকাজ। এ ঘটনা ২০১৭ সালের।

সড়কের আয়ু দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণ বের করতে ওই বছর ১৮টি সড়কে জরিপ চালায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এতে দেখা গিয়েছিল, প্রায় প্রতিটি সড়কই ‘আন্ডুলেশন’ সমস্যায় আক্রান্ত। একই কারণে অতি দ্রুত সড়ক গলে যাওয়ার প্রমাণ পায় পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও (আইএমইডি)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ ত্রুটির কারণেই সড়কে ‘আন্ডুলেশনের’ মতো সমস্যার উৎপত্তি হয়। বিশেষ করে নিম্নমানের ও ভেজাল বিটুমিন ব্যবহারের কারণে সড়ক-মহাসড়কে এই সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে প্রতিবছর সড়কে উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা। বিপরীতে কমছে সড়কের আয়ু আর বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্ঘটনা। টেকসই সড়ক উন্নয়ন করতে হলে দেশি ভালো মানের বিটুমিন ব্যবহারের পাশাপাশি নির্মাণকাজে তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিটুমিনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন উপজাত হিসেবে বিটুমিন সরবরাহকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, যা মোট চাহিদার ১৩ শতাংশেরও কম। বাকি বিটুমিনের জন্য আমদানিকারকদের দ্বারস্থ হতে হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিটুমিন আমদানি করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মানহীন বিটুমিন আমদানির ভয়াবহ চিত্র। অর্ধেক বিটুমিন আর অর্ধেক তারপিন দিয়ে একটি ড্রাম ভরে তার নাম দিচ্ছে আমদানি করা বিটুমিন। একটি অসাধু সিন্ডিকেট এটি নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদন ছাড়াই দেশে ঢুকছে মানহীন বিটুমিন। ফলে আমদানিকারকদের সরকারের নির্ধারিত কোনো পরীক্ষার মুখেই পড়তে হয় না। এ সুযোগে তারা আমদানি করছে নিম্নমানের বিটুমিন। উল্টো দিকে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদিত বিটুমিনকে পদে পদে দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। উত্তীর্ণ হওয়ার পরও নানা কারণ দেখিয়ে দেশের উৎপাদনকারীদের নিরুৎসাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৫টি জেলায় শত শত সড়কের বিভিন্ন জায়গা দেবে গেছে কিংবা খানাখন্দ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রাস্তা নির্মাণের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে অসৎ আমদানিকারকরা মিলে একটি বিটুমিন সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থের লোকসান হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তাগুলোও টেকসই হচ্ছে না।

বিটুমিন বিশেষজ্ঞ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুস সাকিব বলেন, দেশের বেশির ভাগ রাস্তায় দেখা যায় বিটুমিন থেকে পাথর আলাদা হয়ে যায়। এর মূল কারণ হলো, বিটুমিনের সঙ্গে পাথরের যে লেগে থাকার প্রবণতা, সেটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর একমাত্র কারণ হলো নিম্নমানের বিটুমিন।

সওজ অধিদপ্তরের পেভমেন্ট ফেইলিওর ইনভেস্টিগেশন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ফরিদপুর, ঢাকা-সিলেট, সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী জাতীয় মহাসড়কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কে ‘আন্ডুলেশন’ সমস্যার চিত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপথের কয়েকজন প্রকৌশলী জানান, সড়ক ও মহাসড়কে ওভারলোডিং তো আছেই, পাশাপাশি নিম্নমানের বিটুমিনের ব্যবহারও ‘আন্ডুলেশনের’ জন্য দায়ী। ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের বিটুমিন সবচেয়ে ভালো।

ইস্টার্ন রিফাইনারির কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানি করা বেশির ভাগ বিটুমিন ৮০ থেকে ১০০ গ্রেডের, যা খুবই নিম্নমানের। বিটুমিন আমদানির এলসি খুলে নিয়ে আসা হয় ভেজাল কেরোসিন মেশানো আলকাতরা। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে সরবরাহ করা বিটুমিন আর দেশে বেসরকারিভাবে উৎপাদিত একটি কম্পানির বিটুমিন ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের, যা বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, বিএসটিআই ও বুয়েটের অনুমোদন না নিয়েই আমদানিকারকরা ভেজাল ও নিম্নমানের বিটুমিন দেশে নিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বিটুমিন ছাড় করানোর আগে বিএসটিআই, বিপিসি কিংবা বুয়েটের মাধ্যমে পরীক্ষা না করেই ছাড় করিয়ে আনছেন অসাধু ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বন্দরের একটি অসাধু সিন্ডিকেট। বছরের পর বছর এসব অসাধু সিন্ডিকেট মিলে আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিটুমনি আমদানি করছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিটুমিন আমদানিকারক আর ঠিকাদারদের অনিয়ম ও জালিয়াতির আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অসদুপায় অবলম্বন করে বিটুমিনের সঙ্গে গিলসোনাইট নামে এক ধরনের কেমিক্যাল মিশিয়ে বিটুমিনের পরিমাণ বাড়ায়। ওই গিলসোনাইট বিটুমিনের সঙ্গে মেশানোর কারণে বিটুমিনের বন্ডিং (বিটুমিনের কংক্রিট ধারণ) ক্ষমতা কমে যায়। গুণগত মানে পাতলা ও বন্ডিং ক্ষমতা কম হওয়ার কারণে গ্রীষ্মকালে এ ধরনের নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহৃত সড়কগুলো গলে ঢেউয়ের আকার ধারণ করে। সৃষ্টি হয় অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। আবার বৃষ্টির সময় বিটুমিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সড়কের এসব অংশে পানি জমে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং খানাখন্দের সৃষ্টি হয়।

উৎপাদন থেকে আমদানি পর্যন্ত কিভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিটুমিনের গুণগত মান নষ্ট করেন তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আইইউটির সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুস সাকিব। তিনি বলেন, ‘এমন একটা জাহাজ থেকে আমরা বিটুমিন নিচ্ছি যেটি তিন-চার মাস সাগরে ভাসছে। জাহাজের ইঞ্জিন অয়েলসহ কিছু জিনিস এতে মিশছে। মূলত চোরাইভাবে কিংবা মানহীনভাবে তৈরি হওয়া বিটুমিনই বাংলাদেশে আসছে। আবর্জনাকে বিটুমিন ভেবে আমরা আমাদের রাস্তায় ব্যবহার করছি।’

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের একজন নেতা জানান, সব আমদানি করা বিটুমিনের শুল্ক একই। কিন্তু গুণগত মানে অনেক ভেজাল আছে। যেখান থেকে আনা হয়, সেখানে নানা ধরনের বিটুমিন আছে। ২০০ থেকে ৭০০ ডলার মূল্যের বিটুমিনও আছে, কিন্তু আমদানিকারকরা এখানে নিম্নমানের বিটুমিন আনছে।

বিপিসির একজন পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, অনুমোদন ছাড়া বন্দর থেকে বিটুমিন খালাস করার বিষয়ে সরকারের কঠোর হওয়া উচিত।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশের মহাসড়কগুলোতে ভালো মানের বিশেষ করে ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের বিটুমিনের ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই ৩৫.০০.০০০০.০৩২.০৬.০৩৯.১৫-৪১১ নম্বর স্মারকের ওই চিঠিতে কঠোরভাবে বলা হলেও আমদানিকারকরা পাত্তাই দিচ্ছেন না। একইভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে আমদানি করা বিটুমিন সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নকাজে ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশিদ খানের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, সড়ক মহাসড়কের টেকসই উন্নয়ন করতে হলে অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গুণগত মানসম্পন্ন বিটুমিন ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উন্নত মানের বিটুমিনের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড থেকে সরবরাহ করা বিটুমিনের গুণগত মান ভালো। আর আমদানি করা বিটুমিন খুবই নিম্নমানের, যার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া বেসরকারিভাবে একটি কম্পানি উন্নত মানের বিটুমিন উৎপাদন করছে, সেটাও ব্যবহার করা যায়, সেই কম্পানির বিটুমিনের গুণগত মান অনেক ভালো। সূত্র: কালের কণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত