প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. লেলিন চৌধুরী: করোনাকালে ডাক্তার ও পুলিশের সম্পর্ক

ডা. লেলিন চৌধুরী: করোনাকবলিত বাংলাদেশে মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। নানাধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমণের রাশ টেনে ধরার প্রয়াস চলছে। তারই অংশ হিসেবে দেশব্যাপী সাতদিনের লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। লকডাউনের সময় জনচলাচল সীমিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পথে নেমেছে। তারা অপ্রয়োজনে বের হওয়া মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং কখনো আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তির আওতায় আনছে। লকডাউনের গত পাঁচদিনে পুলিশ ও চিকিৎসকের মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে চিকিৎসকসমাজ,পুলিশবাহিনী এবং জনসাধারণ সবার মধ্যে একধরনের অস্বস্তি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিষয়টি কারও কাম্য নয়।

দেশে করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ হিসাবে ‘সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন ২০১৮’ -র বিধান অনুযায়ী সারাদেশে লকডাউন দেয়া হয়েছে। যেহেতু মহামারী নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকদের মূল ভূমিকা থাকে সেজন্য এই আইনে তাদেরকে কতোগুলো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো ডাক্তারদের কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়া যাবে না। বাধা দেওয়াটা হবে দন্ডনীয় অপরাধ। গত ১৪ এপ্রিল লকডাউন শুরু হয়। কর্তব্যপালনের উদ্দেশে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সেদিনই একাধিক ডাক্তারের গাড়িকে জরিমানা করা হয়। আরও কিছু ডাক্তারকে হয়রানির শিকার হতে হয়। পুলিশ তাদের কাছে মুভমেন্ট পাস চেয়ে পায়নি বলে এই ঘটনাগুলো ঘটে। এসব ঘটনা আলোচনায় এলে পুলিশ সদরদপ্তর বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয় ডাক্তারসহ মোট ১৮ ধরনের নাগরিকের মুভমেন্ট পাসের দরকার হবে না। ইস্যু করা মুভমেন্ট পাসের কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলে পুলিশের মহাপরিদর্শক একে ‘সহায়তামূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন। ধারণা করা হয়েছিল লকডাউনের দ্বিতীয় দিন থেকে পুলিশের দ্বারা ডাক্তার হয়রানি বন্ধ হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। লকডাউনের প্রথম পাঁচদিনে সারাদেশে কমপক্ষে ৩০টি হয়রানির ঘটনা জানা গিয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে ডাক্তার সমাজে একধরনের ক্ষোভ বিরাজ করছিল। গত ১৮ এপ্রিল রোববার ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে একজন নারী চিকিৎসকের আইডি চেক করতে চাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাক্তার ও পুলিশের ভূমিকা আবারো আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্নটি হলো পুলিশ কি ডাক্তারদের আইডি চেক করতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে খোঁজ করা দরকার ডাক্তারদের কি আইডি কার্ড আছে? সরকারি চাকরিতে যোগদান করা ডাক্তারদের আইডি কার্ড প্রদানের কোনো প্রচলন ছিলো না। মাত্র গতকাল (১৮ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে চাকরিরত কোনো ডাক্তার চাইলে মন্ত্রণালয়ে ওয়েবসাইট থেকে তার আইডি কার্ড ডাউনলোড করে নিতে পারবে। সচিবালয়ে চাকরিরত সবাইকে আইডি কার্ড প্রদর্শন করে অফিসে প্রবেশ করতে হয় বলে তাদের আইডি কার্ড থাকে। ডাক্তারদের হাসপাতালে প্রবেশের জন্য আইডি কার্ড দেখানোর নিয়ম নেই। বাংলাদেশের ডাক্তারদের এক-তৃতীয়াংশ সরকারি চাকরি করে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশের অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যুক্ত। আবার অনেকে নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। ডাক্তারদের একটি অংশ কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা শুধু কনসালটেন্ট হিসাবে রোগী দেখে। অনেকে নিজের চেম্বারে রোগী দেখে। এরা সবাই আইডি কার্ড কোথায় পাবে? কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কি ভেরিফাইড আইডি কার্ড ইস্যু করতে পারে? কোনো ব্যক্তি কি নিজে নিজের আইডি কার্ড ইস্যু করতে পারে? যে ঘরে বিড়াল নেই, সেই ঘরের বাসিন্দাকে বিড়াল দেখাতে বললে সে কী করবে?

তাহলে ডাক্তার পরিচয় দানকারী ব্যক্তি ভুয়া কিনা সেটা কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? এদেশে ভুয়া ডাক্তার, পুলিশ অফিসার, ম্যাজিস্ট্রেট, সেনা অফিসার, প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল অফিসার ইত্যাদি আমারা দেখেছি। তাই সকল ভুয়া শনাক্ত করার উপায় পুলিশকে জানতে হয়। ডাক্তারদের শনাক্ত করার সহজতম উপায় হলো তার বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর। ডাক্তার পরিচয় দানকারীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর পুলিশসহ যেকোনো ব্যক্তি চাইতে পারে এবং তিনি এটি দিতে বাধ্য। কেবলমাত্র এই নম্বর দিয়েই একজন ডাক্তারকে শনাক্ত করা যায়। হাতে থাকা মোবাইল ফোনে বিএমডিসি-র ওয়েবসাইটে রেজিষ্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সার্চ দিলেই ডাক্তারের ছবিসহ সকল বৃত্তান্ত স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। সবমিলিয়ে মিনিট দুয়েক সময় লাগবে। বিষয়টি বাংলাদেশের পুলিশ জানে না এমনটি নিশ্চয়ই কেউ বলবেন না।

তাহলে সমস্যা কোথায়? সব জায়গাতেই আমাদের প্রধান সমস্যা হলো ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা। আইন প্রণীত হয়েছে মানুষের কল্যাণার্থে। তাই সবদেশে আইনের প্রয়োগ বলতে ‘মানবিক প্রয়োগ’ বোঝান হয়। আইনের যান্ত্রিক প্রয়োগ একদিকে যেমন আইনের অর্থ বদলে দেয়, অন্যদিকে বিস্তর অনর্থের জন্ম দেয়। যেকোনো ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শনের দ্বারা আইন তার মানবিকতা হারায়। সেটা যেমন পুলিশের জন্য সত্য তেমনি ডাক্তারের জন্যও সত্য। মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান বিষয়কে তুচ্ছ ঘটনার সাথে যুক্ত করতে হয় না- এই সহজ সত্যটি সবার মনে রাখা দরকার। পুলিশ জানে ডাক্তারদের মুভমেন্ট পাস লাগে না। তব্ওু তারা পাশ দেখতে চায়। ডাক্তারদের আইডি কার্ডের বিষয়টিও তারা জানে। তারপরেও কার্ড দেখাতে বলে এবং জরিমানা বা হয়রানি করার ফাঁকফোকর খুঁজে। তারা ক্ষমতা দেখাতে চায়।

পুলিশ ভুলে যায় করোনার মহাদুর্যোগে লকডাউন দেওয়া হয়েছে ডাক্তারদের কাজটিতে সহযোগিতা করার জন্য।  ডাক্তাররা সবসময় স্পেশাল ট্রিটমেন্ট প্রত্যাশা করে কারণ অতীতকালে তারা অনেক ভালো ছাত্র ছিল। একটা হামবড়া ভাবে তারা আছন্ন থাকে। এজন্য তারা ছোটখাটো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে। যে-ব্যাপারটিকে এড়িয়ে গেলে ঝামেলা তৈরি হয় না সেটাকেও তারা অনেকসময় বিষয় করে তুলে। অবশ্য জনসাধারণ পুলিশ ও স্বাস্থ্য দুটি বিভাগের বিষয়ে সমান সমালোচনা মুখর। এলিফ্যান্ট রোডে ‘নষ্ট নাটক’ তৈরির সময় সেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার ভূমিকাটাও যথাযথ ছিল না। সবমিলিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সম্মানিত সদস্যদের অবনতির দৃশ্য দেশবাসী ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে প্রত্যক্ষ করলো। তবে এই কুকর্ম শুরুর নায়ককে কি খুঁজে বের করা জরুরি নয়?

করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডাক্তাররা হলো সম্মুখসারির প্রধানযোদ্ধা। তাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাদের উত্যক্ত বা হয়রানি করা সর্বতোভাবে অগ্রহণযোগ্য। করোনার দুঃসময়ে পুলিশের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তারা সবকিছু নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের কর্তব্যপালনে সহযোগিতা করা নাগরিক দায়িত্ব। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব যতোবেশি বাড়বে দেশবাসী ততোবেশি উপকৃত হবে। ডাক্তার ও পুলিশের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়াতে যারা তৎপর তাদের সুযোগ দেওয়া যাবে না। লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সর্বাধিক পঠিত