প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শূন্য শিল্প-কারখানা,বন্ধ ব্যাংক, বিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ: [১] জান্তা সরকারের ক্ষমতার লালসায় নিমিষেই দশকব্যাপী পিছিয়েছে মিয়ানমারের অর্থনীতি

লিহান লিমা: [২] বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক শাসনের অবসানের পর গত এক দশকে হ্রাস পেতে শুরু করা দারিদ্র ও বিদেশী বিনিয়োগ আসতে শুরু করার মতো অর্জনকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় করছে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকোচন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

[৩] মিয়ানমারের ব্যাংকগুলো বন্ধ রয়েছে, সরকারী কর্মকর্তারা কাজ করতে প্রত্যাখ্যান করেছেন। শিল্প-কারখানার কর্মীরা কাজ ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন, বিদেশী কোম্পানিগুলো নিজেদের বিদেশী কর্মীদের মিয়ানমার ছেড়ে যেতে বলেছে। পুরো দেশজুড়ে বন্ধ রয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট ও ওয়্যারলেস ব্রডব্যান্ড সংযোগ। সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে মিয়ানমারের অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, এ বছর মিয়ানমারের অর্থনীতির দ্বিগুণ সংকোচন হতে পারে।

[৪] মিয়ানমার ইতোমধ্যেই এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর একটি। দেশটির ৬০ লাখের মতো মানুষ প্রতি দিন ৩.২০ ডলারেরও কম অর্থে জীবন-যাপন করেন। অপুষ্টির কারণে মিয়ানমারের এক চতুর্থাংশ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার ফিরে আসার পর দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসতে শুরু করে, যার ফলে ২০১০ সালে থাকা দারিদ্রের হার ৪২.২ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে নেমে আসে ২৪.৮ শতাংশে। তবে গত এক দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পুনরায় পেছন দিকে যেতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ৩.২০ ডলারের নিচে জীবন-যাপন করা দারিদ্র জনগোষ্ঠির হার ২০২১ সালে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যার ফলে এক বছরে দেশটিতে দরিদ্রের সংখ্যায় যুক্ত হবেন আরো ১৮ লাখ বাসিন্দা।

[৫] সেনা অভ্যূত্থানের পূর্বে বিশ্বব্যাংক ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটির অর্থনীতির ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বসমীক্ষা দিলেও এখন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশটির জিডিপি ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে। অ্যানালিটিক্যাল ফার্ম ফিচ সলিউশন বলছে, ক্রয় কমে যাওয়া ও কম রাজস্বের কারছে এটি ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে।

[৬] মিয়ানমারের বৃহত্তম ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক কেবিজে কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে তাদের ৫০০টি ব্রাঞ্চ হতে মাত্র ১৪টি ব্রাঞ্চ খোলা রেখেছে। রিটেইল ব্যাংক ‘মিয়ানমার ওরিয়েন্টাল ব্যাংক’ এর রিলেশনশীপ অফিসার কেয়ুং তেত বলেন, ‘কর্মী ও মানবসম্পদ ব্যতীত অর্থনীতি চলমান রাখা সম্ভব নয়।’ কেয়ুং গত ফেব্রুয়ারি থেকেই অফিসে যাচ্ছেন না।

[৭] বুধবার অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মিন অং হ্লিয়াং রাষ্ট্রায়াত্ত এক গণমাধ্যমে বলেন, ‘গণবিক্ষোভ দেশকে ধ্বংস করে ফেলছে।’

[৮] ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুইজন জানান, না খুললে ব্যাংকগুলোর ওপর জরিমানা করার হুমকি দিয়েছে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে কর্মী সংকটে ভুগছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। কাজ করতে প্রত্যাখ্যান করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০০ কর্মীকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এক জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেন, তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে রয়েছেন।

[৯] ধর্মঘটে অংশ নেয়া সরকারী কর্মীরা সহকর্মীদের জন্য আর্থিক সহায়তায় তহবিল গঠন করেছেন। আন্দোলনের নেতা জ ওয়াই সুয়ি বলেন, কিছু সমর্থক নিজেদের জমি বিক্রি করছে, বিদেশে থাকা ধনী নাগরিকরা তহবিল সহায়তা করছেন। আমাদের লক্ষ্য হলো সেনাবাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলা।

[১০] দেশটির শিল্প-কারখানায় অর্থনৈতিক প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে দেখা গিয়েছে। মিয়ানমারের প্রায় রপ্তানির এক চতুর্থাংশের যোগান দেয়া দেশটির পোশাক শিল্প অর্ডার হারাচ্ছে। সুইডেনের হেনেস এন্ড মারিৎজ ও ইতালি বেনেটেনের মতো প্রধান প্রধান ব্র্যান্ডগুলো নতুন অর্ডার বাতিল করেছে। পোশাককর্মীরা কাজ না করায় খাঁ খাঁ করছে শিল্পাঞ্চলগুলো।

[১১] ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এক রেস্টুরেস্ট মালিক বলেন, মহামারীতে তার ভরসা ছিলো অনলাইন অর্ডার। কিন্তু এখন ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ায় বিক্রি ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছে।

গত এক দশকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের কিছুটা অগ্রগতি হচ্ছিলো। ইউরোপিয়ান ও নর্থ আমেরিকান পর্যটকদের সেবা দেয়া ক্যাটারিং সার্ভিস ও ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বালেন, মহামারীতেও তিনি কর্মী ছাঁটাই করেন নি, কর্মঘণ্টা কমিয়ে অর্ধেক বেতন দিয়েছেন। কিন্তু এখন অভ্যুত্থানে কর্মীদের চাকরি ছাড়তে বলতে বাধ্য হচ্ছেন।

সর্বাধিক পঠিত