প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট, বিপুল ক্ষতির মুখে উদ্যোক্তারা: ব্যবস্থা নিতে তিতাসকে বিটিএমএর চিঠি

নিউজ ডেস্ক: গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্পোত্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি কিছু এলাকায় সরবরাহ লাইনের লিকেজে এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় গত প্রায় এক মাস ধরে এ সমস্যা চললেও তা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেই। উপরন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দায় এড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, যেখানে শিল্প কারখানায় স্বাভাবিক গ্যাসের চাপ ২০ পিএসআইয়ের (গ্যাসের চাপ পরিমাপের একক/ পাউন্ডস পার স্কয়ার ইঞ্চি) ওপরে থাকার কথা, সেখানে তা নেমে এসেছে দুই-তিন পিএসআইতে। এ অবস্থায় প্রতিদিন ছোট-বড় স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং মিলের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের কারখানায় উত্পাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গতকাল তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি পাঠিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকনের পাঠানো ঐ চিঠিতে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় গ্যাসের সংকটের কথা তুলে ধরে বলা হয়, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় মেশিনারিজের ক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্যাসের লো প্রেশারের কারণে মিলগুলো চরম আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঈদুল ফিতর আসন্ন। এমন পরিস্থিতিতে মিলগুলো বন্ধ থাকলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতায় অবস্থিত এনজেড টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামান খান জিতু গতকাল বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তার কারখানা প্রতিদিন ১০০ মেট্রিক টন টেক্সটাইল সামগ্রী উত্পাদন করলেও গ্যাসের অভাবে বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১০ থেকে ১৫ মেট্রিক টনে। তাও কাজ করা যায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ থাকার কথা ৩০ থেকে ৪০ পিএসআই। সেখানে এখন পাওয়া যাচ্ছে ৩ থেকে ৪ পিএসআই। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকার উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের সময়মতো সরবরাহ করতে পারছি না বলে নিজের খরচের কয়েক গুণ বেশি টাকায় পণ্য বিমানে পাঠাতে হচ্ছে। আবার নতুন করে কোনো অর্ডারও নিতে পারছি না।’

শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ মার্চ থেকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, আড়াইহাজারসহ কিছু এলাকা ও নরসিংদীর শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত এ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাসহ কিছু এলাকায়ও উদ্যোক্তারা মাঝে মাঝে গ্যাসের সংকটের কথা জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবারও ফতুল্লা এলাকায় গ্যাসের অভাবে দিনভর উত্পাদন বন্ধ ছিল। গাজীপুরের শ্রীপুরের মাধবখোলা এলাকার শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম থাকায় উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেক কাজ করতে হচ্ছে। এছাড়া সাভারের একটি টেক্সটাইল মিলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, যেখানে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ থাকার কথা ৮ থেকে ১০ পিএসআই, গতকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা পেয়েছেন মাত্র দুই থেকে আড়াই পিএসআই।

নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী এলাকায় অবস্থিত শিল্প বিশেষত টেক্সটাইল মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেবল এ এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে শতাধিক বস্ত্র কারখানার। এর বাইরে অন্যান্য শিল্প মিলিয়ে অন্তত ৪০০ শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এ এলাকায় অবস্থিত মিথিলা টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহার খান বলেন, গতকাল বুধবার কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বেশ কিছু এলাকায় গ্যাসের প্রেশার প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে শত শত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, এসব কারণে রপ্তানি পণ্য সময়মতো শিপমেন্ট করা যাচ্ছে না। আবার অর্ডারও বাতিল হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যত্ নিয়ে বড় শঙ্কার কথা জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর এসব এলাকায় গ্যাসের এই চাপ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, গত ১৩ মার্চ থেকে কাঁচপুর পয়েন্টে হরিপুর গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের গ্যাস রেগুলেশন অ্যান্ড ট্রান্সমিশন সেন্টার থেকে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের মেইন ট্রান্সমিশন লাইন থেকে প্রচুর গ্যাস বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে এ সমস্যার সমাধানে অনুরোধ জানালেও সমাধান মেলেনি, বরং তিতাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর জন্য দূষছেন পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানিকে (জিটিসিএল)। তারা বলছেন, জিটিসিএলের সরবরাহ লাইন থেকে গ্যাসের সঙ্গে প্রচুর ময়লা আসায় তারা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। মূল সরবরাহ লাইনে গ্যাসের ভাল্ব ও ফিলটারিংয়ে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা জানান। কোনো পক্ষ দায়িত্ব না নেওয়ায় প্রায় এক মাসেও সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের গ্যাসের অপচয় হচ্ছে, অথচ শিল্পমালিকেরা গ্যাসের অভাবে কারখানা চালাতে পারছেন না।

ইস্যুটি নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহর মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহূত হয় শিল্পকারখানায়। – ইত্তেফাক

 

সর্বাধিক পঠিত