প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] রাজশাহী অঞ্চলে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর হাঁপিয়ে উঠছে প্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রধান অর্থকরী ফসল

মঈন উদ্দীন: [২] রাজশাহীতে শুক্র ও শনিবারের তাপমাত্রা যথাক্রমে ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

[৩] রোববার দুপুরেও ছিল রোদের প্রচণ্ড তাপ, আর রাতে হালকা ঠাণ্ডা। অনেকেই বলছেন, এটি জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব। আর এসব পরিবর্তনের কারণে এখন পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে।

[৪] এলাকার কোনও টিউবয়েলেই ঠিকমত পানি উঠছে না! ফলে হাঁপিয়ে উঠছে মানুষ ও প্রাণিকুল। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আম-ধান সহ অধিকাংশ ফসল।

[৫] পদ্মা বিধৌত অঞ্চল হওয়া স্বত্বেও কৃষি কাজসহ গৃহস্থালি ও খাবার পানির জন্য এই অঞ্চলের মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। তবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের পাশাপাশি ঠিক মতো রিচার্জ না হওয়ায় প্রতিনিয়ত এই অঞ্চলের পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে রাজশাহীর মানুষকে পানির জন্য হাহাকার করতে হবে। আর তাই তারা বিকল্প উৎস সন্ধানের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের ওপর জোড় দিতে বলছেন।

[৬] রাজশাহীর জনস্বাস্থ্য বিভাগসহ এনজিও ভিত্তিক সংস্থাগুলোর সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আশি’র দশকে রাজশাহীতে ভূগর্ভের ৬০ থেকে ৭০ ফিট নিচেই পানির স্তর পাওয়া যেতো। ১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প (বিএমডিএ) চালুর পর এ অঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপণ শুরু হয়।

[৭] এসব নলকূপ জমিতে সেচ দেওয়ার কাজে ব্যবহার হয়। তবে গত ৩০ বছরে বিএমডিএর পাশাপাশি নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যক্তি উদ্যোগেও হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ফলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে বরেন্দ্রভূমিতে স্বাভাবিক পানির স্তরের তুলনায় ১০০ ফুটের বেশি নিচে নেমেছে। বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলে ১৭০ ফুট নিচে পানির স্তর। এর ফলে গভীর নলকূপগুলোর যা সক্ষমতা তার চাইতে ৫০ ভাগ পানি পাওয়া যাচ্ছে। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা। এসব এলাকার জলাধারগুলোতেও পানি কমে এসেছে।

[৮] বাঘা উপজেলার তেপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক দুলু সরকার এবং স্কুল শিক্ষক আবু সাঈদ বৃটেন বলেন, এখন ঘরে-বাইরে কোথাও যেনো একটু স্বস্তি নেই। প্রখর রোদের ফলে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে পড়ছে। জলাশয়, খাল, বিল শুকিয়ে যাওয়ায় তরমুজ ক্ষেতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিওবয়েলেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। মোটর দিয়ে ট্যাংকিতে পানি তুলতে এখন তিন গুণ বেশি সময় লাগছে। খরায় পুড়ছে ফসলের ক্ষেত। প্রচণ্ড রোদে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে ভয় পাচ্ছে। এক কথায় খরা এবং তীব্র তাপদাহে সকল প্রাণী কুলের নাভিশ্বাস উঠেছে।

[৯] বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান (জনি) বলেন, প্রতি বছর চৈত্র মাসে সূর্য থেকে যেন আগ্নেয়গিরির উদগীরণ ঝরে পড়ে। এতে করে হাঁপিয়ে উঠে মানুষ-সহ প্রাণীকুল। বর্তমানে পুকুর এবং ছোট-খাট জলাশয় গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বাঘা উপজেলার অনেক উঁচু এলাকায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। অপর দিকে প্রচণ্ড রোদের তাপ এবং গরমের ফলে ঝরে পড়ছে এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আমের গুটি।

[১০] তিনি জানান, এ ছাড়াও বোটা শুকিয়ে খসে পড়ছে গাছের লিচু। দিনভর সূর্যতাপে নুইয়ে পড়ছে গাছের পাতাও। নেতিয়ে পড়েছে সবজি। ফসলি ক্ষেত বৃষ্টির অভাবে অনেকটা ক্ষতির সম্মুখীন। এর মধ্যে ইরি ধানের ক্ষেত ফেটে একাকার। এই কৃষি কর্মকর্তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ফসল, গবাদি পশু, মৎস্যখাতে গুরুতর ক্ষতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে।

[১১] রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে পানির স্তর নেমে গেছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে জলাধারগুলোতে। একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের দিকে জোড় দিতে হবে। অন্যথায় এই অঞ্চলে কৃষি সহ সব ধরনের কাজে পানির ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সম্পাদনা: জেরিন আহমেদ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত