প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফুটেজ দেখে শনাক্ত: তদন্তে আসছে হেফাজত-জামায়াত বিএনপি-আ.লীগ নেতাদের নাম

নিউজ ডেস্ক: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাজুড়ে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা। ক্ষতবিক্ষত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এসব স্থাপনাসহ শহরজুড়ে ধ্বংসের ছাপ। এখনো জায়গায় জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে পোড়া গন্ধ। এই তাণ্ডবলীলার নেপথ্যে হেফাজতের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরও বেশ কিছু নেতার ইন্ধনের তথ্য মিলেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে থাকা হামলার ভিডিও ফুটেজ ও অডিও ক্লিপের মাধ্যমে এসব নেতার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা অধিকতর তদন্ত করছে বলে জানতে পেরেছে দেশ রূপান্তর।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলোচিত ওই হামলার সঙ্গে কারা জড়িত সে তথ্য আছে জেলা পুলিশের কাছে। জেলার পুলিশ সুপার তাদের নাম-পরিচয় জানিয়ে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েও হামলার সঙ্গে হেফাজত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। এলাকাবাসীর পাশাপাশি স্থানীয় নেতারাও নানা ধরনের অভিযোগ করেছেন। হামলার পর এক সপ্তাহ ধরে যেন স্থবির হয়ে পড়েছে শহরবাসীর জীবনযাত্রা। থমকে আছে স্বাভাবিক সব ধরনের কাজকর্ম। এতে বিপাকে পড়েছেন শহরটির বাসিন্দা সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্মরণকালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিজিবি, র‌্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসার সদস্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েনের পাশাপাশি টহল দিতে দেখা গেছে।

জানা গেছে, শহরের যেখানে যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিল, সেখানেই ভাঙচুর ও হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রবেশ করে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। ভূমি অফিস ও সুর সম্রাট আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনসহ এমন কোনো স্থান নেই যেখানে ভাঙচুর করা হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৭৪টি মাদ্রাসা থাকলেও কোনো মাদ্রাসায় হামলা হয়নি। ওই সব মাদ্রাসায় এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী আছে। এলাকার লোকজনের ভাষ্যমতে, সেখানে ১৯৭১ সালের মতোই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার সময় সেøাগান দিয়ে জিহাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে হামলার সময় কোনো ধরনের সেøাগান দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা  জানান, গত বৃহস্পতিবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কিট হাউজে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, এসবির প্রধান মনিরুল ইসলাম, রেলওয়ে পুলিশের প্রধান শাহ আলম, পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন, ডিআইজি (মিডিয়া) হায়দার আলী খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, বিজিবি ও আনসারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন আইজিপি। সমন্বিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সবাইকে কাজ করতে হবে। তাণ্ডবে ইন্ধন ও অর্থের জোগান দিয়েছে যারা তাদের খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। হামলায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে যেসব নেতার নাম আসছে, তাদের বিষয়ে গভীরভাবে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হামলায় ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে মামলা করেন, সে জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা দিতে বলা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘হামলাকারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। এই তা-বলীলার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। ইতিমধ্যে হামলার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই সব ফুটেজে নানা তথ্য মিলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৮ কোটি বাংলাদেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর সঙ্গে আছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আছেন। কেউ ভয় পাবেন না। হামলাকারী ও ইন্ধনদাতাদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করুন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হামলার সঙ্গে শুধু হেফাজত জড়িত না। তাদের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা। ওই সব নেতার লোকজনও তাণ্ডবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিমধ্যে এসব নেতার পুরো প্রোফাইল সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্যপ্রমাণ হাতে এলেই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থান করছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন নেতার নাম এসেছে। এগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে ইন্ধনদাতা ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘তিন দিন আগে হামলাকারীদের বিষয়ে জেলার পুলিশ সুপার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে অনেকের নাম আছে। ওই সব নেতার ব্যাপারে তদন্ত চলছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হামলার সঙ্গে হেফাজত নেতাদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতার নাম আসছে। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা জহিরুল হক খোকন, আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল হক ভূঁইয়া, হেফাজত নেতা মাওলানা সাজেদুর রহমান, মুফতি মোবারক উল্লাহ, মুফতি এনামুল আহসান, জামায়াত নেতা সৈয়দ গোলাম সারোয়ার, কাজী ইয়াকুব আলী, মাওলানা মতিউর রহমান, কোচিং সেন্টারের পরিচালক মনির হোসেনসহ অন্তত অর্ধশত নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। হামলার সময় যারা সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের স্টিল ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। তা ছাড়া এ সংক্রান্ত কয়েকটি অডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে। সবগুলো বিষয়ই আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি।’

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ রেঞ্জের সব কটি স্থানেই যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চালানো হবে। কোনো হামলাকারীকে ছাড় দেওয়া হবে না। যারাই জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে আমরা তদন্ত শুরু করে দিয়েছি। অনেকেরই নাম আসছে। এগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না।’ সূত্র: দেশ রূপান্তর, সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত