প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আহসান হাবিব: ধর্ম কেন রাজনীতির সহজ হাতিয়ার?

আহসান হাবিব: ধর্ম হচ্ছে অবিকশিত মানুষের আশ্রয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতা। প্রকৃতির কোন কোন শক্তির কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব থেকে বাঁচতে তাদের দেবতা বানিয়ে পূজা করা শুরু করে দিত এই অবিকশিত মানুষেরা। ভয় ছিল প্রধান অনুষঙ্গ। ফলে নানা ট্যাবু এবং কুসংস্কার দ্বারা মানুষ আচ্ছাদিত থাকতো। আদিতে এক এক গোষ্ঠী এক একটা দেবতা বানাতো, তাকে ঘিরে তৈরি হতো নানা নিয়ম, আচার। এগুলো নিয়েই এক একটা ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করতো। মানুষ যতো এগিয়ে চললো, প্রকৃতির রহস্যগুলোর কারণ জানতে পারলো, ধর্মগুলো ততো উপযোগিতা হারাতে শুরু করলো। এখন নতুন কোনো ধর্মের উদ্ভব হয় না, কারণ প্রকৃতি এখন মানুষের জানার মধ্যে চলে এসেছে। বলা চলে মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে চলেছে। বস্তুর নানা বৈশিষ্ট্যকে আবিষ্কার করে নিজেদের জ্ঞানের প্রভুত্ব ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। সময়  যতো এগিয়েছে, ধর্মেরও রূপ পাল্টেছে। বহু ঈশ্বর থেকে একেশ্বরবাদি ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। বস্তু ছাড়িয়ে অবস্তুকে শক্তিমান হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

প্রকৃতি ছেড়ে অতিপ্রাকৃত বস্তুকে সীমাহীন শক্তির আধার দেখিয়ে অবিকশিত সমাজের কিছু চতুর মানুষ ধর্ম দাঁড় করিয়ে তাদেরকে অধস্তন বানিয়ে নিজেরা শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মহাবিশ্বের একজনকে সৃষ্টিকর্তা বানিয়ে তার প্রতি অনুগত থাকার জন্য ভয় দেখিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গায়ের জোর। ‘পরকাল’ নামের একটা ইউটোপিয়া হাজির করে মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে শাসন শোষণ শুরু করেছে। লোভ এবং লালসা এর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেছে এইসব চতুর ধর্মগুরুরা যে মানুষ এই বিভ্রম থেকে বরুবার পথ খুঁজে পায় না, নিজেদের সমর্পণ করে বসে। ধর্ম আর আগের জায়গায় না থেকে রাজনীতির স্থান দখল করে বসেছে।

তারা সৃষ্টিকর্তার নামে ধর্মগ্রন্থ প্রণয়ন করেছে, বিবিধ আইন তৈরি করেছে, শাস্তির বিধান করেছে। মানুষ এসব সম্মিলিত শক্তির কাছে পরাজিতের মত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। এসব ধর্মগুরুরা দেখেছে ধর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে বোকা বানিয়ে শোষণ করা সহজ। তাই তারা একদিকে পরকালের শাস্তির ভয় এবং ইহকালের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এই কাজটা চালিয়ে গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানের উদ্ভব ধর্মের চালাকিটা ধরে ফেলে। বিজ্ঞান প্রকৃতির রহস্যকে উন্মোচন করে দিতে শুরু করলে ধর্ম কর্তৃক মিথ্যা মিথগুলো ধ্বসে পড়তে শুরু করে। যদিও বিজ্ঞানের কাজ নয় ধর্মকে প্রতিপক্ষ বানানো, তার কাজ বস্তুর সত্য প্রকাশ করা। এই সত্যগুলোই ধর্মের কাল হয়ে দেখা দেয় এবং মানুষ সত্যের মুখোমুখি হতে থাকে। সময় যতো এগিয়ে চলে, বিজ্ঞান যতো নব নব আবিষ্কারে মেতে ওঠে, ধর্ম ততো তার উপযোগিতা হারাতে থাকে। উপযোগিতা হারালেও ধর্ম এখনো টিকে আছে কেন? টিকে আছে আসলে অবিকশিত সমাজে। যেমন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এখানকার মানুষগুলো জ্ঞান চর্চাকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারেনি। তাদের সব জ্ঞান ধার করা। তারা পাশ্চাত্যের জ্ঞানকে ধার করে নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, গড়ে তুলেছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এই অঞ্চলের মানুষ এখনো প্রকৃতির রহস্যকে বুঝে উঠতে পারেনি। এমনকি মানুষ চাঁদে গেছে, এই সত্যকেও ধারণ করতে পারে না জনগণের বিশাল অংশ।

তারা এখনো চাঁদে মানুষের মুখ দেখে, এখনো গোমূত্র পান করে করোনা তাড়ায়। এমনকি এখানে যে সমস্ত বিজ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্র আছে, তারা বছরের পর বছর পড়ালেখা করেও বিজ্ঞান মনস্ক হতে পারে না। চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, পদার্থবিদ সহ সব বিজ্ঞান পড়ুয়ারা এক একজন পাড় ধর্মান্ধ। এর পেছনের অন্যতম কারণ তারা বিজ্ঞানকে শুধু পড়েছে, আত্মস্থ করেনি। আর একটা কারণ তারাও ধর্মকে পেশাগত এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে ধর্ম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে। সবচাইতে বড় কারণ এখানে মুর্খ মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রধান অবলম্বন ধর্ম। তাদেরকে অধিনস্ত রাখতে তথাকথিত যারা আধুনিক, তারাও ধর্মকে নিজের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে থাকে। তারা দেখে এটাই সবচাইতে সহজ শোষণের পন্থা। যুগ যুগ ধরে এই চলে আসছে। সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ যদি অজ্ঞানতার তিমিরে ডুবে থাকে, রাজনীতিও একে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাদেরকে তিমির থেকে তুলে আনার চেষ্টা তারা করে না, এটা তাদের চাতুরী। এমনকি যাদের রাজনৈতিক আদর্শ অসাম্প্রদায়িক চেতনার, বাম ঘরানার, তারাও ধর্মকে ব্যবহার করে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চল ধর্মকে রাজনৈতিক ব্যবহারের এক সুফলা ভূমি। লেখক : উপন্যাসিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত