প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুয়েজ খালের বিকল্প হতে পারে চবাহার বন্দর

রাশিদ রিয়াজ : সুয়েজখালে চীনা মালিকানাধীন এক বিশাল জাহাজ আটকা পড়ার পর এখালটির ওপর নির্ভরশীল বিশ^ বাণিজ্য অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানি কূটনীতিক কাজেম জালালি বলেছেন সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে ভারত, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যেকার ৭ হাজার ২শ কিলোমিটার নৌরুট সুয়েজ খালের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। এধরনের বিকল্প নৌ রুটের প্রতি আগ্রহ রয়েছে তুরস্কের। চীন, রাশিয়া, ইরান ও তুরস্ক ইতোমধ্যে বিকল্প কৌশলগত বাণিজ্যিক জোট গঠনে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ইরান স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎস হিসেবে চবাহার বন্দরের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। স্পুটনিক

ইরানের প্রেসটিভিকে কাজেম জালালি বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (আইএনএসটিসি) ব্যবহার করা বরং কম ঝুঁকিপূর্ণ। সুয়েজ খালের চেয়ে বিকল্প লাভজনক হয়ে উঠতে পারে এ নতুন রুট। সুয়েজ খাল বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। মস্কোয় নিযুক্ত এই ইরানি কূটনীতিক বলেন চবাহার বন্দর ব্যবহার করলে সেখান থেকে কুড়ি দিনে মালামাল ইউরোপে নেওয়া সম্ভব। খরচও কমবে। ট্রানজিটের ক্ষেত্রে সুয়েজখালের যথাযথ বিকল্প চবাহার বন্দর। ইরান সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ওঠার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এবং তা সম্ভব হলে ভারত থেকে ইউরোপে মালামাল পরিবহনে খরচ কমবে। তুরস্ক রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে চীনের সহায়তায় যৌথ বাণিজ্যি করিডোরে আগ্রহী। তাহলে ইউরোপের দেশগুলোর তুরস্কের ওপর নির্ভরশীলতা আরো বাড়বে। মার্কিন, বিশেষ করে পশ্চিমা একচেটিয়া বাণিজ্যি শক্তি খর্ব করার ক্ষেত্রে বিকল্প চবাহার বন্দর ব্যবহারকে এসব দেশ বড় এক উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে। পাকিস্তানও চবাহার বন্দর যাতে ব্যবহার করে সেজন্যে ইরানের তরফ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে ইরান ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ৪শ বিলিয়ন ডলারের ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়েছে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইরান সফরের সময়ে এধরনের প্রস্তাব দেন। বছর পাঁচেক ধরে আলোচনার পর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চীন ও ইরানের মধ্যে এধরনের চুক্তিতে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমানে দুদেশের বাণিজ্য আগামী এক দশকে বৃদ্ধি করে বছরে তা ৬’শ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, রিনিউবল ও নিউক্লিয়ার জালানি ছাড়াও অবকাঠামো খাতে ইরানে ব্যাপক বিনিয়োগ করবে চীন। এ চুক্তির ফলে দুটি দেশ বেইজিংয়ের বেল্ট এন্ড রোড ইনফ্রাকচার স্কিমে আরো ঘনিষ্টভাবে সংযুক্ত হবে। এ ট্রিলিয়ন ডলারের এ স্কিমের লক্ষ্য হচ্ছে চীনের সঙ্গে ইউরোপ ও আফিকার সড়ক ও জলপথে যোগযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর ফলে ডজনেরও বেশি দেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চীনের সঙ্গে এ চুক্তির ফলে তেহরানের পক্ষে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলা আরো সহজ হবে বলে মনে করছেন। রুহানি বলেন পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এ অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। তার দেশের প্রস্তাবিত হরমুজ শান্তি উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে রুহানি বলেন যৌথ উদ্যোগই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তিকে কৌশলগত রোডম্যাপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রেক্ষাপটে বৈশি^ক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে এটি একটি ভাল বিনিয়োগ। তিনি বলেন তার দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কোনো একটি ফোনকলে পরিবর্তন হবে না। এ সম্পর্ক কৌশলগত ও টেকসই।

প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক বেন নোর্টন এ চুক্তিকে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্লুমবার্গ এ চুক্তিকে বাইডেন প্রশাসনের জন্যে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে ইরানের সঙ্গে চীনের এ চুক্তি তেহরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রভাবের বিরুদ্ধে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজ করবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয় ডলারের বিপরীতে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের একটি বিকল্প মুদ্রা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রচেষ্টার পাশাপাশি এধরনের চুক্তি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া ও নাটকীয়ভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। গত মাসে বাইডেন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ব্যাপারে সবুজ সংকেত না দেওয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেয়ী ঘোষণা দেন ‘মার্কিন পরবর্তী যুগ’ শুরু হল। গত ফার্সি বছরে ইরানের তেল বহির্ভুত বাণিজ্য ৭৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং দেশটি সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করেছে চীনে। চীনে ইরানের তেল রফতানিও বাড়ছে। এরপর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইরাক। তৃতীয় স্থানের রয়েছে আরব আমিরাত। রফতানির আর্থিক মূল্য হচ্ছে চীনে ৮.৯ বিলিয়ন, ইরাক ৭.৩ ও আমিরাতে ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া তুরস্ক হচ্ছে ইরানের চতুর্থ পণ্য আমদানিকারক দেশ।

এর বিপরীতে ইরানে চীন রফতানি করেছে ৯.৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। আমিরাত রফতানি করেছে ৯.৬ বিলিয়ন, তুরস্ক ৪.৩ বিলিয়ন, ভারত ২.১ ও জার্মানি ১.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ইরানে। এসব দেশ থেকে ইরান শস্য, সেলফোন, চাল, ভোজ্য তেল, তেলবীজ, গম আমদানি করেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত