প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিড-১৯ রোগীদের জরুরি ওষুধ: রেমডেসিভির বিক্রিতে দ্বিগুণেরও বেশি লাভ ব্যবসায়ীদের

 বণিক বার্তা: নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী এ রোগের কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কারের হিড়িক পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের গিলিয়াড সায়েন্স কোম্পানি রেমডেসিভির (জেনেরিক নাম বা গ্রুপ) ওষুধটি নিয়ে আসে। অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ হিসেবে এটি বাংলাদেশে ২০২০ সালের মাঝামাঝি উৎপাদনের অনুমোদন পায় আটটি কোম্পানি। কিন্তু সরকারিভাবে ওষুধটির দাম নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ না করায় উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এ ওষুধ। ফলে একজন কভিড-১৯ আক্রান্ত গুরুতর রোগীর সুস্থতায় অনেক টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে স্বজনদের। আর বৈশ্বিক মহামারী পরিস্থিতির সুযোগে জরুরি এ ওষুধ বিক্রি করে দুই থেকে তিন গুণেরও বেশি লাভ করছেন ফার্মেসি ব্যবসায়ী ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো। কোম্পানিগুলো এমআরপি মূল্য বেশি রেখে পাইকারি পর্যায়ে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি করায় সাধারণ ক্রেতারা ঠকছেন বলে মনে করছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্টরা। রোগী ও তাদের স্বজনরা জরুরি এ ওষুধটির দাম কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

শুরুতে প্রতি ১০০ মিলিগ্রামের একটি ডোজের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) রাখা হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। পরবর্তী সময়ে এ দাম কিছুটা কমিয়ে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় নামিয়ে আনে কোম্পানিগুলো। যদিও শুরু থেকে এখন পর্যন্ত খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমআরপি মূল্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কম দামে কভিড-১৯ চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ ওষুধ সরবরাহ করছে উৎপাদক কোম্পানিগুলো। এতে বড় ধরনের লাভ করছে ফার্মেসি ও হাসপাতালগুলো।

দেশের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় প্রতিটি অনুমোদনপ্রাপ্ত কোম্পানিই পাইকারিতে (ডিলার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রেতার কাছে সরবরাহ করা দাম) সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছে রেমডেসিভির। যদিও ওই ইনজেকশনের প্রতিটি কোম্পানির এমআরপি মূল্য রাখা রয়েছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে একজন ক্রেতা বা রোগীর স্বজন প্যাকেটের গায়ে লেখা দামেই ইনজেকশনটি ক্রয় করছেন। তাছাড়া হাসপাতাল পর্যায়ে এ ওষুধের দামের সঙ্গে ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট যুক্ত করলে জরুরি এ ওষুধটির প্রকৃত মূল্য আরো বেড়ে যায়, যা একজন গুরুতর অসুস্থ কভিড-১৯ রোগীর জন্য অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘কভিড-১৯-এর জরুরি ওষুধ হওয়ায় রেমডেসিভিরের দাম নির্ধারণ করেছে কোম্পানিগুলো। প্রথমবার ৫ হাজার ৫০০ টাকা রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পাইকারি পর্যায়ে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিষয়টি আমরা অনুসন্ধান করব। এ ধরনের পার্থক্য ধরা পড়লে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে দাম কমানোর বিষয়ে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

তবে দেশের বিভিন্ন ফার্মেসির ব্যবসায়ীদের দাবি, কভিড-১৯-এর গুরুতর রোগীদের জন্য এ ওষুধটি খুবই প্রয়োজনীয়। ফার্মেসিতে রেমডেসিভিরের মজুদ রাখলে বিক্রি না হওয়ার ঝুঁকি থাকে। করোনা পরিস্থিতি হ্রাস কিংবা বৃদ্ধিজনিত কারণে অবিক্রীত রেমডেসিভির নিয়ে বিক্রেতাদের লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এমআরপি মূল্যের চেয়েও অনেক কম দামে ফার্মেসিগুলোতে এ ওষুধ সরবরাহ করছে। ফলে একটি চালানের এক-তৃতীয়াংশ বিক্রি হলেই বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের কয়েকজন ফার্মেসি স্বত্বাধিকারী বলেন, কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সরকার এ ওষুধের উৎপাদনের পর বিক্রয় মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেনি। ফলে কোম্পানিগুলোও ইচ্ছেমতো দামে এ ওষুধ বিক্রি করছে। মূলত কভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে বড় ধরনের লোকসানের কবলে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে বিনিয়োগ তুলে নেয়ার প্রবণতায় অতিরিক্ত এমআরপি রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, বেক্সিমকো, এসকেএফ, ইনসেপ্টা, স্কয়ার, বিকন, হেলথকেয়ার, একমি ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসকে রেমডেসিভির উৎপাদনের অনুমতি দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সাতটি কোম্পানি এর মধ্যে রেমডেসিভির উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করলেও একমি ফার্মাসিউটিক্যালস এখনো রেমডেসিভির উৎপাদনে যায়নি। এর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বেমসিভির, এসকেএফের রেমিভির, ইনসেপ্টার নিবাভির, স্কয়ারের রেমডিভির, বিকনের রেনডোভির, হেলথকেয়ারের রেমডেভির ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস রেমডিভির নামে রেমডেসিভির ইনজেকশন বাজারজাত করছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের উৎপাদিত রেমডেসিভিরের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য রেখেছে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া অন্য ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো রেমডেসিভিরের দাম শুরুতে ৫ হাজার ৫০০ টাকা রাখলেও বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় নামিয়ে এনেছে। যদিও হেলথকেয়ার ছাড়া প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই পাইকারি পর্যায়ে রেমডেসিভিরের দাম রেখেছে ২ হাজার টাকার মধ্যে। হেলথকেয়ার তাদের উৎপাদিত রেমডেসিভির (ব্র্যান্ড নাম রেমডেভির) ফার্মেসি ও হাসপাতালগুলোকে সরবরাহ করছে মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি কোম্পানি উৎপাদিত রেমডেসিভির থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত লাভ করছে ফার্মেসি ও হাসপাতালগুলো। ফার্মেসিগুলো এমআরপি মূল্যের চেয়েও কিছুটা কম দামে বিক্রি করলেও হাসপাতালগুলো কভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্ধারিত দামই রাখছে। তাছাড়া অনেক হাসপাতাল ওষুধের দামের সঙ্গে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট যুক্ত করছে। –

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত