প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু: বিশেষজ্ঞ মতে ডিজিটাল অপরাধ দমনে ব্যর্থ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

সমকাল: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল অপরাধ দমন করতে ব্যর্থ। বরং অনলাইন মাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে, যা ব্যাপক অর্থে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। আলাপকালে আইন বিশেষজ্ঞরা এ মত দিয়েছেন। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, শুধু মতপ্রকাশের দায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদ কারাগারে মারা গেলেন। এর প্রতিবাদে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে খুলনায় রুহুল আমিন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেই। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়েছে। এসবই হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের উদাহরণ।

এর আগে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য এই আইনে সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, কার্টুনিস্ট, আলোকচিত্রীসহ অসংখ্য মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার হয়েছেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। কিন্তু এ আইনে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা চুরি, সার্ভার কিংবা ডিভাইস থেকে তথ্য চুরি কোনোটিরই বিচার করা হয়নি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গি মতপ্রকাশ, নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কথা বলা, বিজ্ঞানচিন্তা কিংবা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে বক্তব্যের জন্যও এ আইন প্রয়োগের নজির নেই। বরং আইনটি বার বার প্রগতিশীল চিন্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'ভাবমূর্তি' ক্ষুণ্ণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা পৃথিবীর আর কোনো দেশের আইনে নেই। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের অধিকারের বিষয়টি এই আইনে পুলিশকে ব্যাখ্যার অধিকার দেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুলিশের কাছে মামলার সুযোগ দেওয়ার কারণেই আইনটির ব্যবহারে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

কত মামলা: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ১৯৭টি, যেখানে ৪১টি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশের দায়ে। ১৯৭টি মামলায় ৪৫৭ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৪১ মামলায় ৭৫ জন পেশাদার সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮৯টি। এর মধ্যে ৭২১টি মামলা থানায় এবং আদালতে ৪৬৮টি। এর মধ্যে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। দেখা যায়, ২০২০ সালে মামলা কম হলেও আগের বছরের তুলনায় বেশি সংখ্যক সাংবাদিক এই বিতর্কিত আইনের শিকার হয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার ক্ষেত্রে বেশির ভাগই হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে। মামলার অভিযোগগুলো হচ্ছে কটূক্তি, পোস্টের মাধ্যমে মানহানি করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা এবং ধর্মের অবমাননা। মামলা করেছেন সরকারি দলের এমপি, আমলা, এমনকি সরকারি দলের পরিবহন নেতারাও। যেমন ২০২০ সালের ২৬ মে করোনা মহামারির কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাস চালানোর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে পোস্ট দেওয়ার কারণে দৈনিক মানবজমিনের পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম রতনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পরিবহন নেতা আব্দুস সোবহান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। পুলিশ মামলার সঙ্গে সঙ্গে রতনকে গ্রেপ্তার করে। এখানে দেখা যায়, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাস চলাচলের নির্দেশ দেওয়ায় পরিবহন নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পুলিশ সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা পরিবহন নেতাদের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় পেশাদার সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে।

২০২০ সালের ২২ মে হবিগঞ্জে 'আমার হবিগঞ্জ' পত্রিকায় ওই এলাকায় ত্রাণ চুরির খবর প্রকাশ হয়। এ খবর প্রকাশের দায়ে পত্রিকাটির সম্পাদক সুশান্ত দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গ্রেপ্তার করে সুশান্ত দাশগুপ্তকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ত্রাণ চুরির দায়ে অভিযুক্ত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীর অনুগত সাংবাদিক নামধারী এক ব্যক্তিকে এই মামলার বাদী হিসেবে দেখানো হয়।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের জেরে ওই পত্রিকার সম্পাদকসহ প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন সরকার দলীয় এক এমপি। খবরটির লিংক নিজের ফেসবুকে শেয়ার করার কারণে আরেকজন সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। মামলা দায়েরের পর পরই তিনি নিখোঁজ হন। প্রায় ৫৩ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২ মে তাকে যশোরের বেনাপোল থেকে আটক দেখায় পুলিশ। পরে সরকারি দলের এমপির দায়ের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরই মধ্যে তিনি জামিন পেয়েছেন, কিন্তু মিডিয়াকে কিছুই বলছেন না।

এর আগে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনের সময় ফেসবুকে সরকারের সমালোচনা করায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হলে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে: আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ভাবমূর্তি-সংক্রান্ত ধারাগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাকস্বাধীনতা সীমিত করা। বিশেষ করে সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে- এমন অভিযোগে জেলে পুরে দেওয়াই হচ্ছে এ ধারাগুলোর লক্ষ্য। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই ফৌজদারি আইনে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের কোনো বিধান নেই। বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে 'ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ'কে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করাকে বিশ্ব ফৌজদারি আইনে বড় 'অবদান'ই বলতে হবে। এ অবদানের ফলটাও বাংলাদেশে দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে। এ দুই বছরে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও বাকস্বাধীনতা সীমিত করার জন্য সরকার শত শত মামলা করেছে। এই আইন যতদিন থাকবে, ততদিন সীমিত সাংবাদিকতা এবং খণ্ডিত বাকস্বাধীনতার দেশেই বাস করতে হবে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইরের ২৩, ২৫, ২৮, ২৯, ৩২ ধারাগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে, এগুলো প্রয়োগ করলেই তা অপপ্রয়োগ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে যে তথ্যপ্রযুক্তি আইন হয়েছিল সেখানে মামলা করার বিধান ছিল শুধু আদালতে। ২০১৩ সালে এই আইন সংশোধন করে পুলিশের কাছে মামলা দায়েরের সুযোগ রাখা হয়। এরপর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ব্যাপক অপপ্রয়োগ দেখা যায়। এরপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৫৭ ধারা বাতিল করা হলেও ওই ধারার সবকিছু নতুন আইনে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এখানেই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ সংবিধানের ৩৯ ধারায় বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার শুধু উচ্চ আদালতের। অর্থাৎ, কারও বক্তব্যে বাকস্বাধীনতার সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব কেবল উচ্চ আদালতের। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশ মামলা নিচ্ছে এবং নিজেরাই ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এটা স্পষ্টত সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান এটাও স্পষ্ট করে বলেছে, কোনো আইনেই সংবিধানে দেওয়া মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বরং সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের অনিরাপত্তা তৈরি করেছে এবং ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধেই সমালোচনার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা চুরির মতো ঘটনার ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া যাবে না। কিন্তু কোনো সচেতন নাগরিক যদি এই ডিজিটাল চুরির কোনো সমালোচনা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মুহূর্তেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা যাবে।

এই বিতর্কিত আইনটি সংশোধনের জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকেও চাপ আসে। সম্পাদক পরিষদ কয়েক দফা এই দাবি জানায়। সরকারের তরফে সম্পাদক পরিষদকে এই আইনের বিতর্কিত ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে তা করা হয়নি। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি মনিটর করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএফইউজে- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ডিজিটাল অপরাধ দমনের প্রয়োজনে একটি আইনের দরকার আছে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। এ আইনে শাস্তি ও জরিমানা বাড়ানো হয়েছে অত্যধিক। আমরা ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি করেছিলাম। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুরো ৫৭ ধারা রাখা হয়েছে। জঙ্গি মত দমনের জন্য এ আইনের প্রয়োগ দরকার ছিল। কিন্তু এখন এ আইনটি লেখক-সাংবাদিক ও সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনটি সমাজে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ফলে এ আইনটি পর্যালোচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইনের অপপ্রয়োগ সম্পর্কে বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, শুরু থেকেই শঙ্কা ছিল এই আইনটি পেশাদার সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগ করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সেই শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকদের কোনো লেখা পছন্দ না হলেই প্রভাবশালীরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন। এই আইনটির প্রয়োগ কীভাবে হচ্ছে, আইন প্রয়োগে কী ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ আছে- সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। ডিজিটাল অপরাধ দমনে আইন হতে পারে, তবে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে।

সর্বাধিক পঠিত