প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: আমার একুশ, আমাদের একুশ

ড. সেলিম জাহান: একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আমার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহন করছিলেন তিনি। রেডিও কথোপকথন সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে। ভদ্রলোক ক্রাইস্টচার্চের কাছাকাছি ছোট্ট শহর আকারোয়াতে থাকেন – সেখান থেকে একটি বাংলা বেতার কেন্দ্র চালান। আকারোয়াতে ১০ ঘর বাঙ্গালির বাস। ভদ্রলোকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়- সন্দেহ নেই। মনে আছে, ১৯৮৯ সালে কার্যোপলক্ষে আকারোয়া গিয়েছিলাম অস্ট্রেলীয় বন্ধু পিটার ক্যানীয়ানের সঙ্গে। একটি ছোট্ট কাঠের গীর্জা আমার মন কেড়েছিলো। আলাপ জমেছিলো গীর্জার পাদ্রীর সঙ্গে। তার অনুরোধে ক’লাইন লিখে দিতে হয়েছিলো গীর্জার অতিথি-বহিতে।

লেখার সময়ে ভদ্রলোক হেসে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এই গীর্জায় আপনিই হয়তো প্রথম ও শেষ অতিথি’। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই আকারোয়া থেকে আমন্ত্রণ এলে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। সুতরাং নির্দ্দিষ্ট দিনে বসা গেলো রেডিও সাক্ষাৎকারের জন্যে। কথা শুরু হলো একুশে ফেব্রুয়ারি পালন, প্রভাতফেরি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দিয়ে। এক পর্যায়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা একুশে ফেব্রুয়ারির কি তাৎপর্য্য আপনার কাছে?’ আমি এক লহমা থামলাম, জানালার বাইরে রাস্তার ওপারের গাছটির ঝিরি ঝিরি পাতার দিক তাকালাম, বেতারে বাদনরত যন্ত্রসঙ্গীতের শব্দ আরো মৃদু করে দিলাম। তারপর তার প্রশ্নের জবাব দিলাম।

‘একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য্য তিনটে- একটি স্মৃতির, একটি অবদানের এবং অন্যটি শক্তির’, আমি থামি। ও পক্ষের নিস্তবদ্ধতা টের পাই- ভদ্রলোক হয়তো গতানুগতিক কোনো উত্তর প্রত্যাশা করেছিলেন- এই যেমন, ‘একুশ আমার প্রেরণা’, কিংবা ‘একুশ আমার ঐতিহ্য’, কিংবা ‘একুশ আমার অহংকার’। একটু পরেই ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন, ‘একটু খোলাসা করবেন কি?’ করলাম খোলাসা। ‘একুশে ফেব্রুয়ারিআমার জন্যে একটি স্মৃতির জায়গা। ভাষা আন্দোলন এবং একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা যখন ঘটে, তখন আমি এক বছরের শিশু। সুতরাং বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি আমার কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।

কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারির একটি স্মৃতি আমি আমার জন্যে আমার মনে তৈরি করেছি। সে স্মৃতি তৈরি হয়েছে ইতিহাস আর স্মৃতিচারণা পড়ে, ঐ সময়কার নানান ছবি দেখে, এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে। সেই সঙ্গে আমার নিজের মায়াময় স্মৃতি আছে নানান বছরে বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে খুব ভোরের নগ্নপদে প্রভাতভেরীর, সবাই মিলে সেই কালজয়ী সঙ্গীত- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ গাইবার, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক নামিয়ে রাখার। সেই গান এখনো আমার ধমনীতে এক অনুরণন তোলে, আমি শিহরিত হই। আমি  দেখিনি বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি, কিন্তু একুশে ফেব্রয়ারির স্মৃতি আমার আছে।

দ্বিতীয়ত: একুশে ফেব্রুয়ারির একটি অবদানের দিক আমাকে সদাই আন্দোলিত করে। একুশ শুধু আমাদের মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার আন্দোলন ছিলো না, এটা ছিলো বাঙালি জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সংগ্রাম। এবং সেই সংগ্রাম ছিলো আমাদের সকল আন্দোলনের, সকল লড়াইয়ের, সকল দাবির অনুপ্রেরণা-উৎস। একুশের হাত ধরেই হয়েছে চুয়ান্নর সংগ্রাম, বাষট্টির আন্দোলন, তার অনুপ্রেরণায় জন্মলাভ করেছে ছেষট্টির ছয়-দফা, ঊনসত্তুরের গণআন্দোলন এবং একাত্তরে আমাদের চ‚ড়ান্ত স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। বায়ান্নোর একুশে যে পথযাত্রার শুরু, তার সমাপ্তি ঘটেছে ১৯৭১- এ। এই পথযাত্রার প্রতিটি ফলকে আমরা একুশ থেকে শিক্ষা নিয়েছি, একুশ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি, আমাদের সব সঙ্কটকালে বারবার ফিরে গিয়েছি একুশের কাছে, একুশ আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে সামনে।

তৃতীয়ত: একুশ আমাকে এক অনন্য শক্তি দেয়। যখনই ভাবি যে মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে একদল মানুষ তাদের জীবন দিয়েছে, তখন এক ধরনের শক্তি আমি অনুভব করি। পৃথিবীতে নানান দেশে মানুষ স্বাধীনতার জন্যে জীবন দিয়েছে, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রাণ বিসর্জন করেছে, কিন্তু শুধু ভাষার জন্যে জীবন দিয়েছে বাংলাদেশ ভিন্ন এমন উদাহরণ আর শুধু ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরে ঘটেছে। এই সত্যটি আমাকে উদ্বুদ্ধ করে।

আমি ভাবি আগামী দিনগুলোতে যে কোনো সঙ্কটে, যে কোনো  বিপর্যয়ে, যে কোনো সংগ্রামে একুশ আমাদের শক্তি জোগাবে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়,  দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের সংগ্রামে, তারা শক্তি খুঁজে পাবে একুশের কাছে। আমরা বারবার ফিরে যাবো একুশের কাছে- একুশ আমাদের নিরন্তর শক্তির উৎস।’ আমি কথা শেষ করি। একটি অদ্ভুত নিশ্চুপতা আকারোয়া- লন্ডনেখুব মৃদুস্বরে ভদ্রলোক উচ্চারণ করলেন, ‘এতো সুন্দর করে বললেন’। আসলে যে কথাটি তাকে বলা হয় নি, তা হচ্ছে, পৃথিবীর যেখানে আমি থাকি না কেন, এক টুকরো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি হৃদয়ে বহন করি। আলাপচারিতার আগে বলিনি, এবার বলি, ‘একুশ আমার ঐতিহ্য, আমার অহংকার, আমার প্রেরণা’।  ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত