প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা: বাংলার বুদ্ধিজীবী : ‘ত্রয়ী শক্তি ত্রিস্বরূপে প্রপঞ্চে প্রকট’

মাসুদ রানা : নোম চমস্কির মতে, সমাজে দু’প্রকারের বুদ্ধিজীবী থাকেন। প্রথম প্রকারটি হলো টেকনোক্র্যাটিক এ্যান্ড পলিসি-ওরিয়েণ্টেড ইণ্টেলেকচুয়্যল Technocratic and policy-oriented intellectuals) বা বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারী বুদ্ধিজীবী, এবং অন্যটি হলো ভ্যালু-ওরিয়েণ্টেড ইণ্টেলেকচুয়্যাল (oriented intellectuals) বুদ্ধিজীবী। বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারী বুদ্ধিজীবীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাদি ভোগ-ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্মাণে ও নতুন প্রজন্মকে ক্ষমতার কাঠামোর পক্ষে দীক্ষিত করতে তাদের মেধা ও বুদ্ধি বিনিয়োগ করেন। মূল্যবোধগত বুদ্ধিজীবীরা প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে অস্বীকার করে, প্রাতিষ্ঠনিক সুযোগ-সুবিধাদি প্রত্যাখ্যান করে তাদের নীতি, কর্ম ও ফল নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা করেন।এঁদেরকে বলা হয় ‘ভ্যালু-ওরিয়েণ্টেড ইণ্টেলেকচুয়্যাল’। এঁদেরকে ‘পাবলিক ইণ্টেলেকচুয়্যাল’ বা জন-বুদ্ধিজীবীও বলা হয়।

বাংলাদেশে তৃতীয় এক প্রকারের বুদ্ধিজীবী আছেন, যাঁরা একদিকে প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত থেকে, সেবা দিয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাদি ভোগ-ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন; এবং অন্যদিকে সরাসরি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের মৌলিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় না এমন প্রচলনের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সমালোচনা করে জনগণের কাছে একটি বিদ্রোহী ভাব প্রকাশ করে থাকেন। এ-প্রকারের বুদ্ধিজীবীদের বলা যেতে পারে ‘পপুলিস্ট ইণ্টেলেকচুয়্যাল’ (Populist intellectuals) [পাঠক যেনো বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকার ‘ইণ্টেলেকচুয়্যাল পপুলিজম’এর (intellectual populism) সাথে বিষয়টি গুলিয়ে না ফেলেন]। পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ কখন রুষ্ট হয় না। কারণ, প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ জানে যে, এ-প্রকারের বুদ্ধিজীবীরা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতি হুমকি তৈরি করছ্নে না বরং এমন কতিপয় বিষয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন এবং সমালোচনা করেছেন, যার দ্বারা জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র আকর্ষিত হচ্ছে। পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবীদের আপনি চিনবেন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে এঁদের নীরবতা পালন কিংবা পরোক্ষ সমর্থন দান এবং জনগণের পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণাকে কাজে লাগিয়ে নানা অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পপুলিস্ট রেটোরিক বলে জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করে। এভাবে পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাবান শ্রেণীর আদর ও বঞ্চিত শ্রেণীর শ্রদ্ধা উভয়টি ভোগ করে নন্দিত হয়ে থাকেন।

তবে, বলে রাখা ভালো যে, পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবীরা যদি নিশ্চিত হতে পারেন যে বর্তমান প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ শক্তিহীন হয়ে ভেতর থেকে কিংবা আক্রান্ত হয়ে বাইরে থেকে ভেঙ্গে পড়ছে, তাঁরা কাল বিলম্ব না করে মূল্যবোধগত বুদ্ধিজীবীদের চেয়েও অধিক আগ্রহ ও স্পর্ধা নিয়ে পতনুন্মুখ প্রতিষ্ঠ্না ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বলতে শুরু করেন। অন্যথায়, তাঁদের জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি অনুভব করেন, যা তাঁদের কাছে অসহনীয়। উপরের তিন প্রকারের বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত অবস্থান কী-কী, তা বুঝতে আমরা উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের আপেক্ষিক অবস্থান ও ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারি। উদাহরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে ধারণাগুলো পরিষ্কার করা। অর্থাৎ, উদাহরণ এখানে লক্ষ্য নয়। বাংলাদেশে শিক্ষার স্তর নির্বিশেষে মোটাদাগে তিন প্রকারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা আছে তিন সামাজিক শ্রেণীর জন্যে। উচ্চবিত্তের জন্যে আছে এলিটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে বাংলার চেয়ে ইংলিশ ভাষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং স্বদেশ, স্বজাতি, স্বসংস্কৃতি, মাতৃভাষা ইত্যাদির ওপর আলোকপাত কম থাকে।

দ্বিতীয় প্রকারের শিক্ষা-ব্যবস্থাটি প্রধানতঃ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্যে, যেখানকার শিক্ষার মাধ্যম বাংলা, যদিও খণ্ডিতভাবে ইংলিশ ভাষাটাও শেখানো হয়। এই শিক্ষা-ব্যবস্থায় স্বদেশ, স্বজাতি, স্বসংস্কৃতি ও মাতৃভাষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যদিও সম্প্রতি তাতে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তৃতীয় প্রকারের শিক্ষা-ব্যবস্থাটি প্রধানতঃ নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্যে, যেখানকার প্রধান ফৌকাস হচ্ছে ধর্ম এবং ভাষা হিসেবে আরবি সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত, যদিও সেখানে বাংলাও শেখানো হয়। তবে, এ-শিক্ষা-ব্যবস্থায় স্বদেশ, স্বজাতি, স্বসংস্কৃতি ও স্বভাষার ধারণাটি ধর্ম-নির্ভর।

বলাই বাহুল্য, তিন প্রকারের শিক্ষা-ব্যবস্থা তিন প্রকারের বিশ্ববোধ, জীবনবোধ, জাতি-বোধ, স্বদেশ-বোধ, সাংস্কৃতিকবোধ ও আত্মপরিচয়বোধ তৈরি করে বাঙালী জাতিকে ক্রমশঃ ত্রিধা-বিভক্ত করে চলেছে। এ-পরিস্থিতিতে উপরে সংজ্ঞায়িত তিন প্রকারের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোন প্রকারটি কী ধরণের ভূমিকা পালন করছে?

টেকনোক্র্যাট ও নীতিনির্ধারী বুদ্ধিজীবীরা এ-তিন শিক্ষাব্যবস্থার স্রষ্টা না হলেও সৃষ্টির সহায়ক এবং রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে এর প্রতিপালক ও পরিচালকের ভূমিকা পালন করছেন।এ-বুদ্ধিজীবীদের সিংহভাগ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্যে গঠিত দ্বিতীয় প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থার সৃষ্টি হলেও তাঁরা নিজের সন্তানদেরকে প্রধানতঃ এলিট শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত করছেন। অর্থাৎ, টেকনোক্র্যাট ও নীতিনির্ধারী বুদ্ধিজীবীদের কাছে আদর্শ শিক্ষা বলতে যা বুঝায়, তা দ্বিতীয় প্রকারের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় কিংবা তৃতীয় প্রকারের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত বলেই তাঁরা কার্যতঃ মনে করেন। ফলে, তাঁরা নীরবে বর্তমানের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা ও পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

মূল্যবোধগত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউ-কেউ এ-বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন কিন্তু তাঁদের বোধগত সীমাবদ্ধতার জন্যে কার্যকর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছেন না। এমনকি এঁদের অধিকাংশ নিজের সন্তানদের জন্যে শিক্ষাব্যবস্থা নির্বাচন করতে গিয়ে ঘোষিত মূল্যবোধটি ধরে রাখতে পারছেন না। তাঁরা সাধারণ শিক্ষার মানের নিম্নগতি লক্ষ করে নিজেদের সন্তানদেরকে এলিট শিক্ষাব্যবস্থার অধীন শিক্ষিত করছেন।ফলে, এখানে তাঁদের মূল্যবোধের সাথে বাস্তব চর্চার একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে এবং এই দ্বন্দ্বের কারণে তাদের সংগ্রামও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবীদের কাছে যেহেতু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে রুষ্ট না করে প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিরুদ্ধে জনমনোরঞ্জনমূলক সমালোচনা করে জনপ্রিয়তা অর্জন করাই তাদের লক্ষ্য, তাই তাঁরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে না বলে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ধর্মাশ্রিত শিক্ষাব্যবস্থার গ্লৌরিফিকেইশন বা মহাত্ম্য করছেন। তাঁরা অনেকেই যেমন নিজেরা ঐ শিক্ষাব্যবস্থার সৃষ্টি নন, তেমনি তাঁদের সন্তানদেরকেও তাঁরা ঐ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হতে পাঠাননি। তারপরও তাঁরা ঐ শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টি ও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার জন্যে এটি করছেন।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম যখন মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টিকে শাহবাগ-আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকায় সমাবেশিত করে তার সংখ্যার বিশালত্ব ও শক্তির বিপুলত্ব প্রদর্শন করলো, তখন অনেকেই ভীত হওয়ার সাথে-সাথে ঐ জনসমষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েজন পপুলিস্ট বুদ্ধিজীবী শুরু থেকেই ওদের সমর্থন করছিলেন, এবং কয়েজন পরবর্তী পর্যায়ে আকৃষ্ট হয়ে মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট জনমসষ্টির মনোরঞ্জনের জন্যে মাদ্রাসা শিক্ষার মহাত্ম্য প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন।

প্রথমতঃ এতে রাষ্ট্র ও সরকার রুষ্ট হচ্ছে না; কারণ এটি রাষ্ট্র ও সরকারের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থাকে চ্যালিঞ্জ করেছে না। ফলে, রাষ্ট্রীয় নিগ্রহ বা নিপীড়নের কোনো ভয় নেই এতে। দ্বিতীয়তঃ মাদ্রাসার মহাত্ম্য করলে তেমন কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট একটি বিশাল জনসমষ্টির কাছে জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী স্থান করে নেওয়া সম্ভব।

প্রকৃত জন-বুদ্ধিজীবীরা জনগণের পশ্চাৎপদ চিন্তার মধ্যে আশ্রয় নিয়ে জনপ্রিয় হওয়াকে ঠিক তেমনিভাবে অনৈতিক মনে করেন, যেমনিভাবে তাঁরা অনৈতিক মনে করেন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করাকে। কারণ, তাঁরা জনগণের পশ্চাৎপদ অবস্থান প্রত্যক্ষ করে ব্যতীত হন, বিক্ষুব্ধ হন, এবং তা থেকে তাঁদেরকে বের করে এনে একটি উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে চান। আর, সে-কারণে তাঁদেরকে একদিকে লড়তে হয় প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের অন্যায় ব্যবস্থা ও তার দর্শনের বিরুদ্ধে এবং অন্যদিক সংগ্রাম করতে হয় বঞ্চিত জনগণের পশ্চাৎপদ চিন্তা ও অবস্থানের বিরুদ্ধে। প্রকৃত জন-বুদ্ধিজীবীর হচ্ছে সৃষ্টিশীল ও মৌলিক চিন্তার দার্শনিক, যাঁদের কাজ – কার্ল মার্ক্সের ভাষায় – শুধু জগতকে বিবিধভাবে ব্যাখ্যা করাই নয়, বরং পরিবর্তনের পথ নির্দেশ করা। বাঙালী জাতির জন্যে প্রয়োজন প্রকৃত অর্থে একদল জন-বুদ্ধিজীবী! এদের আবির্ভাব না হলে নতুন প্রজন্মকে পপুলিস্ট বুদ্ধীজীবীদের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাব থেকে মুক্ত করা যাবে না। আর, এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির স্বাধীন সত্তাই হুমকির মধ্যে পড়বে। লন্ডন, ইংল্যান্ড। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত