প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডাকটিকিটে প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে প্রশ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট: রাষ্ট্রীয়ভাবে একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ-সংক্রান্ত কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল, ১৯৭২ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের স্মরণিকায় প্রকাশিত এক হাজার ৭০ জন এবং ডাক বিভাগ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রকাশিত ১৫২টি ডাকটিকিটকে প্রথম দফায় স্বীকৃতির আওতায় আনা হবে। কিন্তু তথ্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে ডাক বিভাগ থেকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ ভুক্ত করে যেসব শহীদ সরকারি কর্মচারীর নামেও ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমকাল

১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে যাচাই-বাছাই অথবা বিভিন্ন মহলের সুপারিশ ও মতের ভিত্তিতে এসব ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামীকাল বুধবার সকাল ১১টায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন-সংক্রান্ত কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়ে সংজ্ঞা নির্ধারণ করার কথা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে প্রথম দফায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে।

১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় দিবস উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশ করে তথ্য মন্ত্রণালয়। এতে নূরুল ইসলাম পাটোয়ারীর একটি নিবন্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রথম এক হাজার ৭০ জনের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সেখানে নাম উল্লেখ করা ছিল মাত্র ১০৯ জনের। যাদের বেশির ভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ চিকিৎসক, গণপরিষদ ও শিল্পীসাহিত্যিক। পরে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১৫২ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে ডাক বিভাগ। দুটি প্রকাশনা মিলিয়ে এদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬১ জন। এর মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় উল্লিখিত ১০৯ জনের মধ্যে ৩৭ জনের নাম আবার ডাক বিভাগের তালিকায়ও এসেছে।

এ নিয়ে কমিটির একাধিক সদস্য সমকালকে জানান, কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডাক বিভাগের তালিকা অনুযায়ী এক হাজার ২২২ জনকে প্রথম দফায় শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হবে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীর প্রচলিত সংজ্ঞায় পড়েন না এমন শহীদ ব্যক্তির নামেও ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন সরকারি কর্মচারীসহ সাধারণ অনেক শহীদ।

সমকালের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ১৯৯৬ সালে ঢাকা ওয়াপদার সহকারী পরিচালক, ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন পাকিস্তান রেলওয়ের অফিস সুপারিনটেনডেন্ট, ১৯৯৮ সালে খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের কর্মকর্তা, ১৯৯৯ সালে পঞ্চগড় জেলার দেবিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের প্রকৌশলীসহ আরও কয়েকজনের নামে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা সবাই-ই অবশ্য একাত্তরে শহীদ হয়েছেন। এসব নাম কমিটির সভায় পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকা প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

তিনি সমকালকে বলেন, আমরা প্রথম দফায় এক হাজার ২২২ জনকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু তার আগে প্রতিটি নামই যাচাই-বাছাই করা হবে। যাদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তাদের ‘বুদ্ধিভিত্তিক অবদান’ রয়েছে কিনা, থাকলে সেটার মানদণ্ড কতটুকু- এগুলোই আমরা খতিয়ে দেখব। তাড়াহুড়া করে কোনো ভুল তালিকা আমরা প্রকাশ করতে চাই না।

তিনি আরও বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা’ নির্ধারণ করতে হবে। এটি এখনও তৈরি হয়নি। যা নিয়ে কমিটি কাজ করছে। তার মতে, বাংলা একাডেমি শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে, সেটিই ‘বেইজলাইন’ হতে পারে। কমিটিতে এ ব্যাপারে আলোচনা হবে।

কবে নাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে- এমন প্রশ্নে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘এক বছর সময় লাগতে পারে। কারণ, জেলা-উপজেলা থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাদের নাম আসবে, গেজেটভুক্তির জন্য প্রস্তাব আসবে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। এ জন্য জেলা-উপজেলায় চিঠি দিয়ে তথ্য চাওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত রয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই এ কার্যক্রম শুরু হবে।’

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, সব পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।

একাত্তরের পর থেকে প্রতিবছরই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে বাংলাদেশের মানুষ। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ ১৪ ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করেছিলেন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরেই বুদ্ধিজীবী হত্যা চালানো হলেও আত্মসমর্পণের আগে, বিশেষ করে এদিন রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীগুলো পরিকল্পিতভাবে একযোগে বুদ্ধিজীবীদের বাসস্থানে হানা দিয়ে তাদের তুলে নিয়ে হত্যা করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ লক্ষ্যে গত বছরের ১৯ নভেম্বর ১১ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গবেষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে এ যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১৩ ডিসেম্বর প্রথম বৈঠক করে ওই কমিটি।

কমিটিতে গবেষক সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক ও গবেষক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন, অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, নিপসম-এর পরিচালক ড. বায়েজিদ খুরশীদ রিয়াজ, গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. চৌধুরী শহীদ কাদের; বীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক লে. কর্নেল কাজী সাজ্জাদ জহির বীরপ্রতীক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত