প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিড টিকায় ভয় নেই

ড. শোয়েব সাঈদ : ২০২০ সালের মার্চে এই তাণ্ডবের সুচনার পর নানা ঘটনা পেরিয়ে বছর শেষে আমরা ২০২১ সালের এই জানুরায়িতে প্রায় ২০ লক্ষ মৃত্যু আর ১০ কোটি ছুইছুই করা সংক্রমন নিয়ে দ্বিতীয় ওয়েভ পার করছি।

২০২০ সালে প্যানডেমিক নিয়ন্ত্রণে আর বিশ্ব অর্থনীতিকে বাঁচানো জন্যে ড্রাগ, ভ্যাকসিন নিয়ে দাপাদাপির মধ্যে ২০২১ সালের শুরু নাগাদ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কল্যাণে মাঠে এসেছে পশ্চিমাদের ডাবল ডোজের তিন তিনটি ভ্যাকসিন, ফাইজার, মডার্না আর এসট্রাজেনেকা থেকে। জনসন এন্ড জনসনের সিঙ্গেল ডোজের ভ্যাকসিনটি মাঠে আসার কথা মার্চে। চীন আর রাশিয়াও ভ্যাকসিন নিয়ে মাঠে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা সহ ইউরোপে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে মাস খানেক হল। এই মুহূর্তে ভ্যাকসিনের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে ভ্যাকসিনেশনের ধীর গতি। ভ্যাকসিনেশনের গতি কয়েকগুন বাড়াতে না পারলে ভ্যাকসিন দিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

২০২১ সালের শুরুতে তথাকথিত ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ ভ্যাকসিন উৎপাদক দেশগুলোর স্বার্থপরতা ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহে সমস্যা তৈরি করতে শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে গাভি বা গ্লোবাল এলায়েন্সের মাধ্যেমে গরীব দেশগুলোকে ভ্যাকসিন দেবার ক্ষেত্রে ধীর গতি আর অনিশ্চয়তা নিয়ে।

সাপ্লাই চেইন আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা বান্ধব এসট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি উৎপাদনের জন্যে চুক্তিবদ্ধ ভারতের বিশ্বখ্যাত ভ্যাকসিন উৎপাদক সেরাম ইন্সটিটিউটের সাথে। সেরামের সাথে বেক্সিমকোর মাধ্যমে তিনকোটি ডোজের চুক্তি এবং এ নিয়ে ভারত সরকারের বারবার আশ্বাস স্বত্বেও বাংলাদেশের ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল। ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশের একটি ঝুড়িতে সব ডিম রাখার মত পরিস্থিতি অর্থাৎ সেরামের মাধ্যমে এসট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের উপর নির্ভর করার জন্যে বিপদে পড়ার ঝুঁকিও ছিল। ফাইজারের ভ্যাকসিনের অতি নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ আর পরিবহণে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকের অভাবে আর মডার্নার সাথে কোন ডিল করতে না পারার কারণে এসট্রাজেনেকা ছাড়া উপায়ও ছিলনা।

ভ্যাকসিন মাঠে আসার একমাস পরেও এরকম একটি অনিশ্চিত অবস্থায় ভারত সরকারের বাংলাদেশেকে ২০ লক্ষ ভ্যাকসিন উপহার দেবার সাম্প্রতিক ঘোষণা সবাইকে আশাবাদী করে তোলে। ভুটান, নেপালকেও ভারত এই উপহার দিচ্ছে।

একুশে জানুয়ারি ভারতের ২০ লক্ষ ডোজ উপহারের সাথে বেক্সিমকোর মাধ্যমে আরও ১৫-২০ লক্ষ ডোজ বাংলাদেশে প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত কোভিড ভ্যাকসিনের যুগে প্রবেশ করল। সেরামের সাথে বেক্সিমকোর মাধ্যমে চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের এসট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির প্রতিমাসে ৫০ লক্ষ করে আগামী ৬ মাসে ৩ কোটি ডোজ পাবার কথা। কোভ্যাক্সের মাধ্যমে আরও প্রায় ৬ কোটি ডোজ ভবিষ্যতে পাবার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন।

বিশ্বব্যাপী কোভিডের টিকা প্রদানের পাশাপাশি টিকার সেফটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। সুপারফিসিয়াল আলোচনার মাধ্যমে ভ্যাকসিন নিয়ে ভীতি সৃষ্টি কোভিড প্যান্ডেমিকের ব্যবস্থাপনার জন্যে খুবই নেতিবাচক হবে বিধায় এই বিষয়ে সতর্কতার সাথে বক্তব্য বাঞ্ছনীয়। নজীরবিহীন দ্রুততার সাথে কোভিড ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হয়েছে বটে তবে উন্নত দেশগুলোর স্বাধীন আর দক্ষ রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের সেফটি বিষয়ে বিস্তারিত বিচার বিশ্লেষণ আর রিভিউ করার পরেই অনুমোদিত হয়েছে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বর্তমান সক্ষমতা দ্রুত ভ্যাকসিন বের করার অনুকূলে। ভ্যাকসিনের সেফটি নিয়ে কোন “স্টেপ” ছাড় দেওয়া হয়নি, দ্রুত হবার মূল কারণ প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ আর আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের সময়টুকু উল্ল্যেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার জন্যে।

কোভিড ভ্যাকসিন কোন অমরত্বের টিকা নয়। ভ্যাকসিন নেবার পর অন্যান্য অসুখ বিসুখে অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাবনা কমারও কারণ নেই। জনগণ যাতে ভুল বার্তা না পায় তার জন্যে ভ্যাকসিনেশন পরবর্তী অসুস্থতার সাথে ভ্যাকসিনকে লিঙ্ক করার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এই বিষয়ে কিছু পয়েন্ট উল্ল্যেখ করতে চাই।

১। নরওয়ে এবং জার্মানিতে টিকা নেবার পর বেশ কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেনের মৃত্যুর সাথে কোভিড টিকার কোন লিঙ্ক এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। নরওয়ে মেডিসিনস এজেন্সীর কাছে কোন নিশ্চিত সম্পর্কের তথ্য নেই। এই অবস্থায় নরওয়ে সরকার বয়স্কদের এই টিকা দান অব্যাহত রেখেছে। নরওয়ের সিনিয়র সিটিজেন কেয়ার হোমগুলোতে সপ্তাহে ৪০০ জনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। কোভিড ভ্যাকসিন নেবার পর স্পর্শকাতরতার কারণে হয়তো স্বাভাবিক মৃত্যুগুলোও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

২। বর্তমান যুগে উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্যেই নিজ দেশে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোন প্রকার ঝুঁকি নেবেনা। ভ্যাকসিনের সেফটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্তে কোন প্রকার ত্রুটি পেলে সঙ্গে সঙ্গেই ভ্যাকসিনেশন বন্ধ করে দেবে। মানুষের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিলে ভ্যাকসিন উৎপাদক কোম্পানিগুলো বড় ধরণের ঝামেলায় পড়বে।

৩) জানুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় চার কোটি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউকে, কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্রে সেফটি নিয়ে প্রমাণিত কোন জটিলতা দেখা যায়নি। হেলথ কানাডা এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিনের সেফটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার মত কিছু পাননি।

৪) ভারতে ৪-৫ লক্ষ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে যাতে ৬০০ এর মত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ আর কর্ণাটকে দুই জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তদন্তে অন্য কারণ সনাক্ত হয়েছে, ভ্যাকসিনের কোন লিঙ্ক পাওয়া যায়নি।

৫) টিকা নিলে শরীরে কিছু সাময়িক প্রতিক্রিয়া হয় যা যুগ যুগ ধরে ডাক্তার, নার্স আর টিকা উৎপাদনকারী, টিকা গ্রহণকারীদের অর্জিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত। পাক ভারত উপমহাদেশের মানুষজন এই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় অভ্যস্ত। ভ্যাকসিন টেম্পারিং করে বা নিয়মনীতি না মেনে ভ্যাকসিনেশনে সৃষ্ট সমস্যার দায় বৈধ ভ্যাকসিনের হতে পারেনা।

৬) পাক ভারত উপমহাদেশে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সবসময়ই নানাধরণের মিথ, গুজব আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। প্রযুক্তি হস্তান্তরে যারা মাঠে কাজ করেন তাঁরা ভাল করেই জানেন প্রযুক্তির সুবিধে বোঝাতে কতোটা কষ্ট করতে হয়। জোর করে ভ্যাকসিন দেবার কিছু নেই। তবে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে, প্রেরণা দিতে এবং ভ্যাকসিন যারা নেবে না তাঁদের জীবনযাত্রায় কিছু অসুবিধে হবার পরিবেশ তৈরি করে যতটুকু সম্ভব জনগণকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসা খুবই জরুরী। কোভিড সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সবাইকে নিয়ে এগুতে হবে। সংক্রমিত হয়ে বা ভ্যাকসিন দিয়ে জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এর ইমিউনিটি হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি বা স্থায়ী সুরক্ষা অর্জনে মাইলস্টোন।

৭) অনুমোদিত কোন ভ্যাকসিনের সেফটি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএসএফডিএ, সিডিসি, হেলথ কানাডা, ইউরোপিয়ান রেগুলেটরি এজেন্সী আর বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন প্রকার সতর্কবার্তা না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত মনে ভ্যাকসিন নেবার মাধ্যমেই আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করে নিজের, পরিবারের, সমাজের আর রাষ্ট্রের প্রতি আপনার দায়টুকু শোধ করতে পারেন। সেফটি সমস্যা হলে সরকারই ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ করে দেবে।

৮) টিকা প্রদানে বিশ্বে এগিয়ে আছে ইসরায়েল। মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশীর টিকা দেওয়া হয়ে গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ শতাংশের একটু বেশী দেওয়া হয়েছে। আজকেই জানা গিয়েছে ইসরায়েলে ব্যাপক টিকা দানের ফলশ্রুতিতে সংক্রমণ নিম্নমুখী হবার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ভ্যাকসিনের ক্রমাগত আত্মপ্রকাশ আর টিকা প্রদানের মাধ্যমে কোভিড লড়াইয়ে শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হলে কোভিড-১৯ একুশ সালে এসে ক্ষয়ে যাবার পথেই এগুবে আর আমরা ধীরে ধীরে ফিরে যাব স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রত্যাশা তো করা যেতেই পারে।

বর্তমানে প্রাপ্ত ভ্যাকসিনের দুইটি ডোজ, একটি নিয়ে দ্বিতীয়টি ভুলে যাওয়া চলবে না, দ্বিতীয়টি নিতে হবে সময়মত।

ভ্যাকসিন নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আবার মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, দূরত্ব মানার মত জরুরী বিষয়গুলো ফাঁকি দেওয়া চলবে না। প্রথম ডোজের কার্যকারিতা ৭০% হলে ৩০% ঝুঁকি ফ্যাক্টর থেকেই যাচ্ছে। ভ্যাকসিন আপনাকে কোভিডাক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করলেও আপনি সংক্রমণ ছড়ানোর কারণ হবেন না এখন পর্যন্ত এই বিষয়টি নিশ্চিত নয়। অতএব, কোভিডমুক্ত এক সকালের প্রত্যাশায় ভ্যাকসিন গ্রহণের সাথে সাথে সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা পর্যন্ত মাস্ক, সাবান আর দূরত্ব বজায় রাখার অভ্যাস চালিয়ে যাবার বিকল্প নেই।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োটেক বিষয়ে বহুজাতিক কর্পোরেটে ডিরেক্টর পদে কর্মরত।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত