প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মূল্য পরিশোধ করছে না আমদানিকারক, বাংলাদেশী পোশাক পড়ে রয়েছে ইতালির ওয়্যারহাউজে

অর্থনৈতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশী পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ দিয়েছিল ইতালিভিত্তিক এক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য রফতানি করলেও এখন পর্যন্ত রফতানিকারক কারখানাকে মূল্য পরিশোধ করেনি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান। পণ্যগুলো বর্তমানে ইতালির লিবোর্ন বন্দরে একটি ওয়্যারহাউজে পড়ে রয়েছে। এদিকে দাম পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক থেকে আর্থিক সুবিধাও পাচ্ছে না রফতানিকারক পোশাক কারখানা।

গত বছরের ১ জুন খোলা এক ঋণপত্রের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৭ হাজার ৯২০ পিস শার্ট ও প্যান্টের ক্রয়াদেশ পায় বাংলাদেশের দেশওয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। ইতালিভিত্তিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ফ্যাশন ইতালিয়ান স্টাইলের দেয়া ওই ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য রফতানি হয় গত বছরের অক্টোবরে, যার মূল্য ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৬০ ডলার (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি)। পণ্যগুলো গত ৯ ডিসেম্বর থেকে ইতালির লিবোর্ন বন্দরের ওয়্যারহাউজেই পড়ে রয়েছে। এখনো এর মূল্য পরিশোধ করেনি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান।

ফ্যাশন ইতালিয়ান স্টাইলের স্থানীয় এজেন্ট এ্যাজমা ফ্যাশনসের স্বত্বাধিকারী ফরিদ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ক্রয়াদেশটি পায় দেশওয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। ব্যাংক লেউমি ইউএসএ নামের মার্কিন একটি ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানীকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল। সময়মতো পণ্য পাঠানো হলেও এর মূল্য পরিশোধ নিয়ে ক্রেতা, ক্রেতার ব্যাংক ও স্থানীয় এজেন্টসহ কোনো পক্ষই সাড়া দিচ্ছে না। অন্যদিকে রফতানি চালানের পণ্য এখন ইতালীয় বন্দরে ফরোয়ার্ডারের ওয়্যারহাউজেই পড়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে।

এ বিষয়ে দেশওয়ান অ্যাপারেলসের কর্ণধার মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, রফতানি হওয়া পণ্যের দাম পরিশোধসংক্রান্ত কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ নিয়ে যথাযথ উত্তর পাওয়া যায় না। ইতালির লিবোর্ন বন্দরে সংশ্লিষ্ট ফরোয়ার্ডার বিল লজিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ওয়্যারহাউজে পড়ে থাকা পণ্যের দাম পরিশোধ না হওয়ায় আমাদের ব্যাংকও চাহিদামতো আর্থিক সুবিধা দিতে পারছে না। ফলে কারখানা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

মূল্য পরিশোধ নিয়ে উদ্ভূত এ সংকট নিষ্পত্তির জন্য সম্প্রতি দেশওয়ান অ্যাপারেলস বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন বলেন, এখনো কোনো সমাধান হয়নি, কিন্তু দেশওয়ানের পেমেন্ট-সংক্রান্ত বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে এ ধরনের ঘটনা অনেক বেড়ে গিয়েছে। এর আগেও দাম পরিশোধ না হওয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ আমরা পেয়েছি।

এ বিষয়ে দেশওয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, ইতালীয় ক্রেতা ক্রয়াদেশটি পাঠানোর ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ মার্কিন একটি অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়েছে। সে অর্থায়নকারী আবার যুক্তরাষ্ট্রেরই ব্যাংক লেউমির মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্রেতার স্থানীয় এজেন্টের ব্যাংকে ঋণপত্র পাঠিয়েছে। স্থানীয় এজেন্টের ব্যাংক হলো ব্যাংক এশিয়া। ব্যাংক এশিয়ায় আসা ঋণপত্রটি আমরা পেয়েছি আমাদের অর্থায়নকারী ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এখন অর্থ পরিশোধ না করায় আমরা বিপদে পড়ে গিয়েছি। ধারাবাহিকভাবে এমন দুটি ঘটনার কারণে ইসলামী ব্যাংকও এখন আমাদের অর্থায়নে খুব একটা আস্থা পাচ্ছে না। আজও ব্যাংকের ম্যানেজার আমাদের ডেকেছিলেন। কীভাবে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে বুঝতে পারছি না।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, রফতানি করার পর ক্রেতাপক্ষ থেকে দাম অপরিশোধিত থাকার মতো বিরোধপূর্ণ ঘটনা স্বাভাবিক সময়েও ঘটে। তবে কভিড-১৯-এর প্রভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বেশি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই বড় গন্তব্যেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই দাম অপরিশোধিত থাকার একাধিক ঘটনা জানা গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কভিডের প্রভাবে মার্কিন পোশাক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান কোল্ডওয়াটার ক্রিক (সিডব্লিউসি) ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। সিডব্লিউসির ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার ধারাবাহিকতায় পণ্য রফতানি করেও দাম পায়নি বাংলাদেশে স্থাপিত পোশাক কারখানা ক্রয়ডন কওলুন ডিজাইনস লিমিটেড (সিকেডিএল)। এ ঘটনা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে আইনি পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের দাম নিয়ে বিরোধ ঘটেই থাকে। কিন্তু কভিড প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব অনেক বেশি মাত্রায় নেতিবাচক। কারণ এমনিতেই কারখানায় ক্রয়াদেশ কম। এর মধ্যে আবার রফতানি করা পণ্যের দাম না পাওয়ায় রফতানিকারকদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে বেশি। কারণ ধারাবাহিক ক্রয়াদেশ না থাকায় ব্যাংকও আর্থিক সুবিধা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে।

কভিড-১৯-এর প্রভাবে ক্রেতাদের ক্রয়চর্চার ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ গোটা এশিয়ার পোশাক উৎপাদনকারীরা জোটবদ্ধ হয়েছেন। স্টার নেটওয়ার্ক শীর্ষক ওই জোট গতকাল এ-সংক্রান্ত একটি বিবৃতিও দিয়েছে।

স্টার নেটওয়ার্কের মুখপাত্র বিজিএমইএ পরিচালক মিরান আলী বলেন, এশিয়ার উৎপাদনকারী ও সংগঠন হিসেবে আমরা একযোগে এগিয়ে অভিন্ন অবস্থানে সম্মত হতে চাই। এ অভিন্ন অবস্থানের মাধ্যমে আমরা একক ও সামষ্টিকভাবে ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের সঙ্গে ক্রয়চর্চা উন্নয়নে আলোচনা করতে পারব।

শুরু থেকেই দেশের তৈরি পোশাক খাতে একের পর এক আঘাত হেনেছে মহামারী। করোনার প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাত শুরুতে কাঁচামালের সরবরাহ সংকটে পড়ে। দেশে তৈরি পোশাক খাতের ওভেন পণ্যের আনুমানিক ৬০ শতাংশ কাপড় আমদানি হয় চীন থেকে। আর নিট পণ্যের কাঁচামাল আমদানি হয় ১৫-২০ শতাংশ। নভেল করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে সংক্রমণ পরিস্থিতির শুরুর দিকে চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে কাঁচামাল সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও রফতানি গন্তব্যগুলোয় মহামারীর ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে চাহিদার সংকট তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করতে থাকে একের পর এক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান।

সূত্রমতে, কভিডের প্রথম ঢেউয়ে ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করা ক্রেতাদের মধ্যে ছিল প্রাইমার্কের মতো বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানও। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইমার্কের পাশাপাশি ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের ক্রেতাই ওই সময় ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল। পরে আবার এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, কিয়াবি, টার্গেট, পিভিএইচসহ আরো কিছু ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান স্থগিত হয়ে পড়া ক্রয়াদেশ পুনরায় বহাল করে। বর্তমানে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ সরবরাহের সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু করেছে।

বিজিএমইএর তথ্য বলছে, এপ্রিল শেষে ১ হাজার ১৫০ কারখানার মোট ৩১৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়। এসব ক্রয়াদেশের আওতায় ছিল ৯৮ কোটি ২০ লাখ পিস পোশাক। অন্যদিকে এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লাখ ৮০ হাজার। এখন কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে আবারো ক্রয়াদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ ৩০ শতাংশ কমেছে বলেও জানিয়েছে বিজিএমইএ। এ পরিস্থিতিতে যে ক্রয়াদেশগুলো আসছে, তার বেশির ভাগই ঋণপত্র ছাড়া। এছাড়া পশ্চিমা খুচরা বাজারের অনিশ্চয়তায় পণ্যের দাম পরিশোধ নিয়েও ঝুঁকি বাড়ছে। এরই মধ্যে উপকরণ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্যের মূল্য হিসেবে ক্রেতাদের কাছে ৮ বিলিয়ন ডলারের পাওনা সৃষ্টি হয়েছে। এ পাওনা আদায় নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন রফতানিকারকরা। সূত্র: বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত