প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভগবান তো মুদির দোকানে…!

ডেস্ক রিপোর্ট : ১৯৮৪ সাল। সুমন মিস্ত্রি। স্ত্রী নীতা বালা আর ১১ বছর বয়সী ছেলে রাজন। নিম্নবর্ণের হিন্দু পরিবার। নিম্নবিত্তও বটে। দিন আনে দিন খায়। সামান্য ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে কোনরকম সংসার চলে। কোনদিন কাজ থাকে, কোন দিন থাকে না। যেদিন কাজ থাকে সেদিনের হাজিরাও আবার নিশ্চিত নয়। হাজিরার টাকা পেলে রফিক হাজীর দোকান হতে নগদ টাকায় বাজার সদাই করা হয়। হাজিরা না পেলে বাকীতে সদাই নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

হাজী সাহেব নিতান্ত ভালো মানুষ বলেই এরকম অনিশ্চিত একজন লোককে বাকীতে সদাই দেন। অন্য কেউ দিতে চায় না। নিজের জাত ভাইয়েরাও না। জাত ভাইয়েরা তো ধর্মটাই তাদের সাথে মিলেমিশে পালন করতে দেন না।

অভাবের সংসারে শখ আহলাদের বলি চড়িয়ে কেটে যাচ্ছিল জীবনের দিনগুলো। বিপত্তি বাঁধল হঠাৎ এক মৌসুমি জ্বরে। জ্বরে কাতর সুমন মিস্ত্রি দু দিন হল বিছানায় শোয়া। চিকিৎসা বলতে সরকারি হাসপাতালের প্যারাসিটামল আর বউয়ের সেবাযত্ন। কাজ বন্ধ। রোজগার বন্ধ। বন্ধ বাজার সদাই। তিনদিনের মাথায় উনুনে চাপানোর মত ঘরে আর কিছু নেই। পতিদেব বেঘোর জ্বরে বেখবর। নীতা বালার কপালে দুশ্চিন্তার ঘাম জমতে শুরু করেছে। আজ কী হবে? পাতে কি কিছু পড়বে? এই অসুস্থ মানুষটা আর বাচ্চা ছেলেটা না খেয়ে থাকবে? সাতপাঁচ ভেবে চুলার পারের তাক থেকে পুরনো বৈয়ামটা নামিয়ে খুলে ফেলল নীতা। ভিতরে উঁকি মেরে খানিকটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে। যাক পঞ্চাশ টাকার একটা পুরনো নোট দেখা যাচ্ছে। আজকের দিনটা পারো করে দেওয়া যাবে। অতি যত্নে নোট টা বের করে ছেলেটাকে ডাকল, রাজন! ও রাজন! রাজন আসতেই স্কুলের কড়া শিক্ষিকার মত নীতা ছেলে কে বুঝাতে লাগল, এই পঞ্চাশ টাকাডা প্যন্টের পকেটে ভর। পকেটে ভইরা পকেটে হাত দিয়া রাখবি। রফিক হাজীর দোকানে ঢুকার আগে কিন্তু হাত বাইর করবি না। দোকানে ঢুইকা টাকাডা হাজী সাবরে দিবি। দিয়া এক কেজি চাইল আর এক পোয়া ডাইল নিয়া সোজা বাড়িত আয়া পড়বি। এদিক ওদিক কোনদিক কিন্তু যাবি না বাবু।

ছেলে মাথা নেড়ে মায়ের কথায় সায় দিয়ে টাকা নিয়ে ছুটল। হাজী সাবের দোকানে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে টাকাটা বের করে হাজী সাহেবের সামনে মেলে ধরে বলল, এক কেজি চাইল আর পোয়া ডাইল দেন।

রফিক হাজী রাজনের দিকে তাকিয়েই বুঝলেন, কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে। তিনি টাকা না নিয়ে প্রশ্ন করলেন, তোর বাপ কই? অরে দেহি না তিন দিন ধইরা। ঘটনা কী? বাবায় বিছানাত পইরা আছে। তিন দিন ধইরা জ্বর। মায় পাডাইছে এই টাকা দিয়া সদাই নিতে।

হাজী রফিক দ্বীনদার মানুষ। দ্বীনের মেহনত ও ফিকির নিয়ে চলা মানুষ। সব শুনে তিনি মিনিট খানেক চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন। সামনে সুমন মিস্ত্রির ছেলে রাজন পুরনো পঞ্চাশ টাকার একটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

খানিক পর হাজী সাহেব চোখ খুলে দোকানের কর্মচারী নবু মিয়াকে ডাকলেন, নবু! একটা টুকরি ল’। দশ কেজি চাইল, দুই লিটার তেল আর এইডা এইডা ল’। নবু মিয়া টুকরিতে সব জমা করল। হাজী সাহেব ক্যাশ থেকে ১৫০ টাকা বের করে নবুর হাতে দিয়ে বললেন, এই টাকা দিয়া কিছু মাছ লইয়া আয় যা। নবু বেড়িয়ে গেল। রাজন আবার বলল, আমার চাইল আর ডাইল দিবেন না? আরে বেডা দিমু। এত তাড়াহুরা করস কে? মাত্র বাজে সকাল ৯ টা। তোর মায় কি এহনি রানব ?

না , এহন রানব না। তয় মায় চিন্তা করব। চিন্তা করব না। তুই বয়। আইসক্রিম খাবি? একটা আইসক্রিম আনায়া দেই? রাজন ভয়, লোভ আর বিস্ময়মাখা চোখে হাজী রফিকের দিকে তাকিয়ে রইল। হাজী সাহেব আইসক্রিম আনিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যে নবু মিয়া মাছ নিয়ে হাজির। হাজী সাহেব নবুর হাতে আরো দুই শ টাকা দিলেন। দিয়ে বললেন, এই বাজার সদাই লইয়া এই ছ্যাড়ার লগে গিয়া বাড়িত দিয়া আয়। বাড়ির দরজায় মাল নামায়া দিয়া টাকা দুই শ পোলাডার হাতে দিয়া তুই আয়া পড়বি। রাজন চোখ চোখ বড় বড় করে একবার হাজী সাহেবের দিকে দেখে। একবার বাজার সদাইয়ের দিকে। হাজী সাহেব ছেলেটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসি দিয়ে বললেন, অর লগে বাইত যা। বাজার আর টাকা তোর মারে দিবি। আর তোর বাপেরে ক’বি ভালা হইলে আমার লগে দেখা করতে।
নবু মিয়া বাড়ির দরজায় সব নামিয়ে দিয়ে টাকা দুই শ রাজনের হাতে গুজে দিয়ে চলে আসল। রাজন চিৎকার করে মা’কে ডাকতে লাগল। নীতা বালা বেড়িয়ে এসে এতো বাজার সদাই হকচকিয়ে গেল। নিজেকে খানিকটা সামলে বলল, এইডি কী? এইডি কইত্তে আনছোস তুই? হাজী সাব পাডাইছে। বাবার অসুখ শুইন্না দোকানের লোক দিয়া এইডি পাডাইছে। তোমার পঞ্চাশ টাকা নেয় নাই। আরো দুই শ টাকা দিছে। বাবায় ভালা হইলে দেখা করতে কইছে। আমারে একটা আইসক্রিমও খাওয়াইছে।
সব শুনে নীতা বালা দরজাতেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। চিন্তার জগত এলোমেলো হয়ে গেছে তার। চোখের কোণে জল জমতে শুরু করছে। খানিকটা ধাতস্ত হয়ে সবকিছু ভেতরে নিয়ে রেখে স্বামীর কাছে গিয়ে বসল।
ধরে আসা গলায় বলল, সাপ্তায় সাপ্তায় মন্দিরে যাইয়া ভগবানরে ডাকি। ভগবান তো মন্দিরে নাই। ভগবান তো মুদির দোকানে! বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। এ কান্না যেন সহজে থামবার নয়।
সপ্তাহখানেক পর। হাজী রফিক সাহেবের বাসায় তিন জন মানুষের নাম পাল্টে দেওয়া হল। আব্দুল্লাহ, আমিনা ও মুহাম্মাদ ।
১৯৮৬ এর দিকে ইসলাম গ্রহণকারী জনৈক ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ভাইয়ের জবানে শোনা। নামগুলো কাল্পনিক।
লেখক : আহমাদ ইউসুফ শরীফ

সর্বাধিক পঠিত