প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইভ্যালির অনিয়মের বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনে চলছে শুনানি

মো. আখতারুজ্জামান: বাংলাদেশে ই-কমার্স একটি উদীয়মান খাত। এখানে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। বাড়ছে বিনিয়োগের পরিমাণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ই-কমার্স দেশের জন্য সম্ভাবনাময় খাত। অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডট কম লিমিটেড বিরুদ্ধে গ্রাহকদের রয়েছে হাজারও অভিযোগ।

ইভ্যালি ডট কম দেশের ই-কমার্সখাতকে সাধারণ মানুষের কাছে কেমন হাস্যরস হিসেবে তৈরি করে চলছে তা জানার জন্য যেতে হবে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে। তাদের প্রত্যেকটি পোস্টে শত শত অভিযোগকারি রয়েছে যারা টাকা পরিশোধ করেও পণ্য পাননি। অবাক করার বিষয় হচ্ছে যারা তাদের পণ্য পায়নি জানিয়ে পোস্টের নিচে মন্তব্য করছেন তাদের প্রত্যেকের মন্তব্যের একটি কমন প্রতিউত্তর দিচ্ছে ইভ্যালি।

আর তা হলোÑস্যার, আপনার অর্ডারটি নিয়ে কাজ চলছে। ডেলিভারির ব্যাপারে পরবর্তী কোনো ধরনের অফিসিয়াল আপডেট আসলে জানিয়ে দেওয়া হবে। অনুগ্রহ করে সময় দিয়ে সহযোগিতা করুন এবং ইভ্যালির সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।

মাসের পর পর অপেক্ষা করেও ইভ্যালি থেকে পণ্য পাচ্ছে না গ্রাহকরা। এটা মূলত প্রচলিত আইনের দুর্বলতার সুযোগে হয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা একমাত্র প্রতিষ্ঠান জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আইন বলছে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা বা পণ্য সরবরাহ না করলে তা ভোক্তা অধিকার হরণ হবে। তবে সেখানে সময়ের কোনো উল্লেখ নেই। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ইভ্যালিসহ বেশি কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইভ্যালির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে তাদের গ্রাহকদের। এসব অভিযোগের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তি হলেও অধিকাংশ অভিযোগ অনিষ্পত্তি অবস্থা রয়েছে।

অফিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন মো. মফিজুল ইসলাম জানান, ইভ্যালির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে তার ভিত্তিতে আমরা তাদের কাছে তথ্য চেয়েছি। তারা আমাদেরকে তথ্য দিয়েছে। আমরা গত ২৫ আগস্ট ইভ্যালির কাছে তথ্য উপাত্ত চেয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে একটি শুনানি হয়েছে। যদিও এটি প্রাইমারি লেভেলের। আরও শুনানি হবে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. আব্দুর রউফ জানান, ইভ্যালির বিষয়ে আমরা তদন্ত করব। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ইভ্যালির বিরুদ্ধে এক হাজারেও বেশি অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তি হলেও অধিকাংশ অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর সভাপতি হয়েছেন সৈয়দ আলমাস কবীর জানান, কোনো ই-কমার্স কোম্পানি যদি প্রতারণা করে তার একটা নীতিবাচক প্রভাব এখাতে পড়বে। কারণ এতে করে ভোক্তাদের মাঝে বিরুপ মানুষিকতা তৈরি হয়। সেই সঙ্গে আমাদের প্রচলিত আইনের কোনো ব্যতয় হচ্ছে কিনা এ বিষয়টিতে আমাদের সবাইকে লক্ষ্য রাখা উচিত। ই-কমার্সে পণ্য ক্রয়ের বিষয়ে গ্রাহকদেরকে সচেতন হতে হবে। দেখতে হবে পণ্য ক্রয়ে কি কি শর্ত দেয়া রয়েছে। শর্তগুলো ভালো ভাবে জানতে হবে। আর গ্রাহকরা যদি এটা করেন তাহলে প্রতারণা অনেকখানি কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের লোগো, নাম এবং অলঙ্কার হুবহু নকল করে প্রচার ও বিক্রির অভিযোগে ই-কমার্স ওয়েবসাইট ইভ্যালি ডট কমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিডেট। গত ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর গুলশান থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা জানান, ইভ্যালির বিরুদ্ধে আমরা এক বছর আগেও একটি মামলা করেছিলাম। এটা দ্বিতীয় মামলা। এই প্রতিষ্ঠাটির বিরুদ্ধে সারাদেশে কমপক্ষে ১০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। ওরা বিভিন্ন সময় ওদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া অফার দিয়ে থাকে। তারা লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেয়। পণ্যের দাম ৫০ বা ৬০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। আর এধরনের অফার সাধারণত গভির রাতেই দিয়ে থাকে।

দিলীপ কুমার বলেন, বর্তমানে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম এবং নিজস্ব ওয়েবসাইট ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের পণ্য বিক্রির চুক্তি নেই। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড তার নিজস্ব চ্যানেলে অলঙ্কার বিক্রি করে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রতারক প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের নাম, লোগো ও প্রোডাক্ট ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, তাদের কাছ গ্রাহকরা যখন পণ্যের জন্য যায় তারা নানা ধরনের টালবাহনা করে। এমন অনেকে গ্রাহক আমাদের কাছে আসে। এতে করে আমাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।
জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও গত ২৬ অগস্ট ইভ্যালির কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইভ্যালির পণ্য কার্ডে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিলো। এক মাস পরে সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে। গত ২৭ আগস্ট বিদেশে অর্থ পাচার ও ব্যবসায়ীক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ই-ভ্যালি ডট কম লিমিটেড এবং এর চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা হচ্ছে বিএফআইইউ। তবে এক মাস পরে ব্যাংক হিসাব আবার চালু করার অনুমতি দেয় বিএফআইইউ।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, তাদের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২০০। বছরে বিক্রির পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকার মতো। অবশ্য এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পণ্য বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছর বাংলাদেশে ই-কমার্সের আকার দাঁড়াবে ১৯৫ কোটি ডলারের বেশি। দেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের বিক্রির পরিমাণ ২০৭ কোটি ডলারের বেশি হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত