প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রস্তুত নোয়াখালী ভাসানচর, বাড়ানো যাবে আরও আবাসস্থল

মাহবুবুর রহমান: [২] ভাসানচরের পুনর্বাসনের জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) স্ট্যান্ডার্ড ক্লাস্টারের নিয়ম মেনে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৩.৯ বর্গমিটারের আবাসস্থল রাখা হয়েছে ইউএনএইচসিআরের স্ট্যান্ডার্ড মেনে ভূগর্ভস্থ পানি এবং পুকুর, হ্রদ ও খালের ব্যবস্থা। একইসাথে ১১ জনের জন্য একটি টয়লেট ও ১৬ জনের জন্য একটি বাথরুমের ব্যবস্থা। রয়েছে খাদ্য সংরক্ষণ সরবরাহ ব্যবস্থা ও ডিজেল জেনারেল, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা।

[৩] সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার জীবন ও জীবিকার জন্য শতভাগ প্রস্তুত ভাসানচর। নিরাপদ আবাসন ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের জন্য প্রায় সব উপাদানই রাখা হয়েছে এখানে। তৈরি করা হয়েছে আবাসিক ভবন, বাজার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, থানা, সুপারশপ, অফিস ও শেল্টার হাউস। পাশাপাশি আছে জীবিকা নির্বাহের নানা সুবিধা। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চর ঈশ্বর ইউনিয়নের এই ভাসানচরের বিশাল কর্মযজ্ঞের দীর্ঘ স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থা। স্বাভাবিক যাতায়াতের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথের স্টপেজ করার কাজ চলছে।

[৪] জানা যায়, এক সময় ভাসানচরে মহিষের আবাদ ছাড়া কিছুই ছিল না। এখন যেকোনো সময় এখানে এক লাখ এক হাজার ৬০ জন গিয়ে বসবাস করতে পারবে। সেই চরকে সাজানো-গোছানো নতুন জনপদে রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। প্রায় তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে নেওয়া এই প্রকল্পের সব কাজই শেষ।

[৫] একরুমে চারজনের থাকার জন্য দ্বিতল বিছানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন ১৬টি রুম, নারী-পুরুষের জন্য আলাদা বাথরুম, টয়লেট ও রান্নাঘর নিয়ে বানানো হয়েছে একেকটি বাড়ি। এমন ১২টি করে বাড়ি নিয়ে একেকটি পাড়া বানানো হচ্ছে। পাড়াগুলোকে বলা হচ্ছে ক্লাস্টার। বিশাল এই প্রকল্পে এমন ১২০টি ক্লাস্টার বানানো হয়েছে। প্রতিটি ক্লাস্টারে দুর্যোগকালের জন্য বানানো হয়েছে চার তলার একটি করে শেল্টার। ২৬০ কিলোমিটার গতির ঝড়েও অটুট থাকবে এসব শেল্টার। দুর্যোগে এক হাজার মানুষ ও ২০০ গবাদি পশু আশ্রয় নিতে পারবে শেল্টারগুলোতে। তবে সেখানে মোট ১০০টি এমন শেল্টার হাউস আছে ভাসানচরে।

[৬] এছাড়া রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার জন্য দুটি ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি ২০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। রয়েছে অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে সব ধরনের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা। এর বাইরে আরো চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে চারটি চারতলা ভবনে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনঅফিস ও বাসস্থান। আলাদা ভবন থাকছে রেডক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট প্রতিনিধিদের জন্য। আরেকটি চারতলা ভবনে অফিস ও বাসস্থান থাকছে আরআরআরসি ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের।

[৭] থাকছে একটি ভবনজুড়ে মাল্টি পারপাস সুপার শপ। পুলিশের একটি পূর্ণাঙ্গ থানা ও একটি ফাঁড়ি থাকছে দুই ভবনে। থাকছে দুটি চারতলা স্কুল ভবন। তিনটি চারতলা মসজিদও থাকছে ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের জন্য। তৈরি হয়েছে দুটি এতিমখানাও। ডে-কেয়ার সেন্টার হিসেবে ব্যবহারের জন্যও রয়েছে আলাদা ভবন। গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য তৈরি হয়েছে নান্দনিক একটি গেস্ট হাউস। এ ছাড়া নেভির অফিসার ও নাবিকদের জন্য ব্যবহার হচ্ছে দুটি নিরাপত্তা ভবন। প্রকল্প এলাকার ভেতরে যাতায়াতের জন্য বানানো হয়েছে ৪২ কিলোমিটার পাকা ও হেরিং বোন রাস্তা। আছে দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হেলিপ্যাড।

[৮] বিদ্যুত্ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এক মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হাইব্রিড সোলার পাওয়ার প্লান্ট, এক মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল জেনারেটর এবং দুটি ৫০০ কিলোওয়াট ডিজেল জেনারেটর বসানো হয়েছে।

[৯] ভাসানচরে আশ্রিতদের রান্নাবান্নার জন্য প্রায় তিন হাজার চুলা বসানোর হয়েছে রান্নার ঘরগুলোতে। এক লাখ লোকের জন্য প্রতি মাসে এক হাজার ১২৫ টন জ্বালানির প্রয়োজন হবে। এই জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার হলে আশপাশে বনভূমি উজাড় হওয়ার শঙ্কা থাকায় জ্বালানি হিসেবে চারকোল বা কাঠকয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া বসানো হয়েছে আড়াই শ বায়োগ্যাস প্লান্ট। ভাসানচরে একসঙ্গে তিন মাসের খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। সেই সঙ্গে ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য ২০৫ ফুট দৈর্ঘ্যের চারটি সুবিশাল ওয়্যার হাউস বানানো হয়েছে।

[১০] প্রকল্প পরিচালক কমোডর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী জানান, যোগাযোগের জন্য পতেঙ্গা পয়েন্ট থেকে ৫১.৮ কিমি হাতিয়া থেকে ২৪.৫ কিমি এবং সন্দ্বীপ থেকে ৮.৩ কিমি। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় এনে প্রাথমিকভাবে ৯ ফুট উচ্চতার ১২.১ কিমি বাঁধের নির্মাণ শেষ হয়েছে। এই বাঁধকে আট স্তরে কম্পেকশন করা হয়েছে। বাঁধে রয়েছে ১৮টি স্লুইস গেট। বাঁধ থেকে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় বনায়নও হয়েছে। ধীরগতির ভাঙন প্রতিরোধে ৪০০-৫০০ মিটার দূরে ওয়েভ স্ক্রিন পাইলিং, গ্র্যাভেল স্থাপন ও জিও ব্যাগ সংবলিত তিন স্তরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরডিপিপি অনুযায়ী ৯ ফুট থেকে ১৯ ফুট বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোর কাজ গত জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে।

[১১] সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দুই বছর ধরে প্রায় ১৪-১৫ হাজার শ্রমিক প্রকল্প এলাকায় কাজ করেছেন। নির্মাণকাজে গতি আনতে ৩০টি আলাদা প্যাকেজে ৩০ জন ঠিকাদার দিয়ে কাজ করা হয়। নৌবাহিনীর আনুমানিক ২০০ সদস্য ও কনসালট্যান্টের ইঞ্জিনিয়াররা নির্মাণকাজ তদারকি করেন। ভাসানচর প্রকল্প বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ স্থাপনাগুলোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে ইউকেভিত্তিক কম্পানি এমডিএম আর্কিটেক্টস। এ ছাড়া সমুদ্রতীর ও বাঁধসংক্রান্ত অঙ্গসংস্থানবিদ্যা অধ্যয়ন এবং পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে ব্রিটিশ কম্পানি এইচআর ওয়ালিংফোর্ড।

[১২] এখানে জীবিকা নির্বাহ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রয়েছে মৎস্য চাষ, স্থানীয় মুরগি এবং টার্কি মুরগির চাষ, ভেড়া পালন, গবাদি পশু পালন, কবুতর এবং হাঁস পালন, দুগ্ধ খামার, ধান ও সবজি চাষ, হস্তশিল্প, মহিলাদের জন্য সেলাই কাজ, বিভিন্ন ভোকেশনাল ট্রেনিং, ট্যুরিজম এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

[১৩] ১৩ হাজার এককের ভাসানচরে মাত্র এক হাজার ৭০০ একর জমির চারদিকে বাঁধ দিয়ে ৪৩২ একরের ওপর আবাসন ও অন্যান্য স্থাপনা করা হয়েছে। ৩৫২ একর জমি নৌবাহিনীর ফরওয়ার্ড বেইজের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। আরো ৯৩২ একর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে। ফলে এখন এক লাখ রোহিঙ্গাকে এখানে স্থানান্তরের পর চাইলে পুরো ১০ লাখকেই ভাসানচরে ধীরে ধীরে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সম্পাদনা: সাদেক আলী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত