প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাকন রেজা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শোনা না শোনার কথা

কাকন রেজা: বর্জন বা বয়কটের ডাক আমাদের ভূখণ্ডে নতুন কিছু নয়। আবার সে ডাকের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াটাও পুরনো। স্বদেশী আন্দোলনে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছিলো। স্বয়ং অনেক রথী-মহারথীরাই সে সময় সে ডাকের বিরোধিতা করেছেন। বলেছেন ,কাপড় পোড়ানো কোনো কাজের কথা নয়। বরং এতে অর্থনীতির ক্ষতি হয়। সুতরাং বর্জন বা বয়কট, বিপরীতে গ্রহণ বা আলিঙ্গনের এই সংস্কৃতি পুরনো। এই ডাক নতুন কোনো আচরণ নয়। হালে যারা এমন ডাকাডাকির পক্ষে বিপক্ষে কথা বলছেন, তারা তাদের অবস্থান থেকে ঠিকই বলছেন। গণতন্ত্রে ডাক দেওয়াটা যেমন, ডাক না শোনাটাও তেমনি গ্রহণযোগ্য। তবে অগ্রহণযোগ্য হলো দ্বিচারিতা। এক যাত্রায় দুই ফল ধরনের কার্যকলাপ। আপনি বললেন, ওই লোকে যে কথাটা বলেছে, তা ক্ষতিকর। ওই কথা আপনারা কানে তুলবেন না। ওই লোকের কাছে যাবেন না। আরেকজন বলছেন, উল্টো কথা। তার কাছে ওই লোকের বক্তব্যও ঠিক, তার সংস্পর্শও মধুর। কিন্তু এর সাথে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়। তখনই ঝামেলটা বাধে।

কেউ যদি বলেন বয়কট বা বর্জনের ডাক মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করছে। তার এমন চিন্তার বিপরীতে সবিনয়ে বলতে চাই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়টি সম্পর্কে আপনার পরিষ্কার ধারণা নেই। যদি বলা হতো কথা যে লোকটি বলছে তার মুখ বন্ধ করে দাও। তাহলে এটা মতপ্রকাশে বাধা হতো। আপনি যদি সেই লোকের বক্তব্য ক্ষতিকর মনে করেন, তবে তা না শোনার ডাক আপনি দিতেই পারেন। বিপরীতে কারো যদি তার ডাক পছন্দ হয়। তাহলে সে শোনার পক্ষে আহ্বান জানাতে পারেন। ধর্ম আর দর্শনের কাজ কী? এগুলো কী করে। ধর্মমতে যে সব অন্যায় তা শুনতে বারণ করে। ধর্ম অন্যের নিন্দাকে নিরুৎসাহিত করে। নিন্দা কী থেমে থাকে, থাকে না। ধর্ম নিন্দার খারাপ দিকগুলো বলে, তারপরেও নিন্দা চলমান। অন্যকে গালি দিতে নিষেধ করে নৈতিকতা, সমাজবিজ্ঞান। তারপরেও গালি থেমে থাকে না। এমন কী বিজ্ঞাপনী গালিও। দর্শনে ভাববাদের বিপরীতে সৃষ্টি হয়েছে বস্তুবাদের। ভাববাদীরা বলেন, বস্তুবাদ কোনো কাজের কথা নয়। উল্টো দিকে বস্তুবাদীরা বলেন, চোখের সম্মুখে যা তাই সত্য। ভাববাদী চিন্তা অলীক। ভাববাদ বস্তুবাদকে অস্বীকার করে, বস্তুবাদ ভাববাদকে। তাই বলে কী বাদাবাদির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

রুদ্ধ হয় তখনই যখন ‘ভয়েজটাকে ‘সিলড’ করে দেওয়া হয়। আর এই ‘সিলড’ করার শক্তি এস্টাব্লিশমেন্টের হাতে। অনেকে অতীতে বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষেও বলেছেন। এই যে ‘বন্ধ’ করে দেওয়ার কথা বা চিন্তা, এটা ক্যানিবাল। খুনি মানসিকতা। সুতরাং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাটাকে বুঝতে হবে। গলা বন্ধ করে দেওয়াটা হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধের বিষয়। কাউকে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি। কারো ভয়েজ সিলড করে দেওয়ার চিন্তা মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিপরীতের। কারো কথা না শোনার ডাক বা শোনার ডাক এর উল্টো। এ দুটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই অংশ। এ দুটো বন্ধ করার ডাকই বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধের ডাক। বয়কট বা বর্জনের সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কোনো সংযোগ নেই। তেমনি এর বিরোধিতার সাথেও কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যারা বর্জন বা বয়কটের পক্ষে-বিপক্ষে বলেন, তাদের দু’পক্ষেরই নিজেদের অতীত আলোচনা করা জরুরি। অতীতকে নির্ভর করেই ভবিষ্যত গড়ে উঠে। অতীতের সাথে বর্তমানের মিল না হলে তা দ্বিচারিতা মানে দুরাচার। আর দুরাচারীদের কথা মূলত অর্থহীন। অন্যার্থে প্রতারণার সামিল।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত