প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কৃত্রিম সংকট, ওষুধের দাম লাগামহীন বাড়ছে

ইনকিলাব : করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ওষুধের দামে অস্থিরতা বিরাজ করছে। যদিও করোনার আগেও গত কয়েক বছর থেকেই ওষুধের দাম বাড়ছিল। কিন্তু করোনায় কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে ইচ্ছেমতো ওষুধের দাম হাঁকছেন দোকানিরা। অ্যান্টিবায়োটিক ও সাধারণ অন্যান্য ওষুধ বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ-চারগুণ দামে। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বহুলপ্রচলিত কয়েকটি ওষুধের দাম নেয়া হচ্ছে আকাশছোঁয়া। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ওষুধের দামের তারতম্য সবচেয়ে বেশি। অবশ্য ওষুধ কোম্পানিগুলোও পরিবহন সঙ্কট ও কাঁচামাল সঙ্কটের কারণ দেখিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে বেশ কিছু অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের পরও থামানো যাচ্ছে না ব্যবসায়ীদের এসব কারসাজি।

সূত্র মতে, মহামারি করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ আবিস্কার হয়নি। এমনকি টিকাও নেই। চলছে নানামুখী গবেষণা। কয়েকটি টিকা আবিষ্কারে গবেষণা প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ টিকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা। তবে ভ্যাকসিন বা টিকা এখনও মানুষের দোরগোড়ায় না আসায় করোনা প্রতিরোধে মানুষ বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুদ করে রাখছে। করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা অনেকটা বেড়েছে। আর এ কারণেও কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে ওষুধের দাম অনেকটা বাড়ানো হয়েছে।

করোনার শুরুতে ওষুধের ওপর চাপ তৈরি হয়। আর গত এপ্রিল মাস থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি ওষুধের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়াই মানুষ ঘরে ঘরে এসব ওষুধ মজুদ করছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সিন্ডিকেট এসব ওষুধ নিয়ে বেপরোয়া বাণিজ্যে নেমেছে। বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে ৩ থেকে চার গুণ বাড়তি দামে এসব ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ওষুধ আরও বেশি দামে বিক্রি করছে চক্রটি। অপ্রয়োজনে ওষুধ ক্রয়ের প্রতিযোগিতা দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করেন অনেক ওষুধ ব্যবসায়ী। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের অভিমত, নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ সেবনে উল্টো বিপদ ডেকে আনতে পারে। সুতরাং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ সেবন কাম্য নয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনের ভেতরেও সমস্যা রয়েছে। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ এখনো কার্যকর থাকায় সেই মান্ধাতা ব্যবস্থায় চলছে সব কিছু। এর সুযোগ নেয় অসাধু কোম্পানিগুলো। নিজেরাই ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে।

গতকাল রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ডের একাধিক ফার্মেসীর বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ ওষুধের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে ওষুধের দামের তারতম্য সবচেয়ে বেশি। কিছু ওষুধের দাম গায়ে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে ওষুধ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বেশি নিচ্ছেন। তাদের মতে, করোনার সময়ে স্কাভো-৬, ইভেরা-১২, প্যারাসিটামল, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, অ্যান্টিহিস্টাসিন, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল ও ভিটামিন সি ট্যাবলেট জাতীয় ওষুধের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটের কারণে দামও বেড়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাড়তি মুনাফার লোভে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্বিগুণ তিনগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। তিন ধাপে চলছে ওষুধের দামের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য। এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানির একই জেনেরিকের একই ডোজের ওষুধের নির্ধারিত মূল্যেই রয়েছে বড় ব্যবধান। এমআরপির (খুচরা মূল্য) বাইরেও ফার্মেসিতে ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্ষেত্র বিশেষে নেয়া হয় আরো বেশি দাম। করোনাকালে যেসব ওষুধের চাহিদা বেশি, সেগুলো নিয়েই নৈরাজ্য বেশি হচ্ছে।

ঢাকার একটি চেইন ওষুধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, নিউরোলজি, হার্ট, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস এমনকি অস্ত্রোপচারের জন্য যেসব ওষুধের প্রয়োজন সেগুলোর দাম বেড়েছে সীমাহীন। স্কয়ারের নিউরো-বি ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪০ টাকা, নিউরোক্যাল ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪০ টাকা, রসুভাস (১০) ১৫০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা, রসুভাস (৫) ৮০ থেকে ১০০ টাকা, টোসার ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, অ্যাডোভাস ৫৫ টাকা থেকে ৬৫ টাকা ইত্যাদি। এ ছাড়া কিছু ওষুধের দাম গায়ে যাই লেখা থাকুক না কেন মার্কেটে প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে ওষুধ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম নিচ্ছেন।

করোনায় চাহিদা বাড়ায় আইভারমেকটিন ৬-এমজি এমআরপি মূল্য ১৫ টাকা লেখা থাকলেও নেয়া হচ্ছে ১০০ টাকার বেশি। করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ডক্সিসাইক্লিন নামের একটি ওষুধের কার্যকারিতার তথ্য দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারের পর থেকেই মানুষ ওই ওষুধের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ব্যাপক চাহিদার কারণে শ্বাসকষ্টের ওষুধ ডক্সিসাইক্লিন, ডক্সিক্যাপ প্রতি পাতার দাম ২০ টাকা হলেও নেয়া হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকা। বর্তমানে এই ওষুধটির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ ফার্মেসিতে ডক্সিসাইক্লিন গ্রæপের ওষুধ নেই বললেই চলে। এছাড়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি, জিঙ্ক এবং ক্যালসিয়াম ডি নামে তিনটি ওষুধের নাম আলোচনায় আসে করোনার সময়ে।

মিটফোর্ডের একটি ওষুধের দোকান মালিক জানান, আগে এক বক্স ভিটামিন সি বিক্রি হতো ৪৭২ টাকায়। এখন তা ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ১০ পিসের আয়রন জাতীয় এক পাতা জিঙ্ক ট্যাবলেট বিক্রি হতো ৩০ টাকা। এখন বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। প্রতি পিসের ২০০ আই ইউর ক্যালসিয়াম ডি আগে বিক্রি হতো ৮ টাকা করে। এখন তা বেড়ে ১৩ টাকা হয়েছে। জমাট বাঁধা রক্ত তরল ওরাডেক্সন গ্রæপের ইনজেকশন অধিক কার্যকর। প্রতি পিস ৩০ টাকা মূল্যে এই ইনজেকশনের দাম বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে।

একইভাবে ৩৬০ টাকার রিকোনিল ২০০ এমজি ৬০০ টাকা, ৪৮০ টাকার মোনাস ১০ এমজি ট্যাবলেট ১০০০ টাকা, ৩১৫ টাকার অ্যাজিথ্রোমাইসিন ৫০০ এমজি ট্যাবলেট ৬০০ টাকা বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া প্যারাসিটামল, নাপা, নাপা এক্সট্রা- ৫০০ এমজির এক পাতা যেটা আগে ছিল ৮ টাকা এখন বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা। ফেক্সোফেনাডিল গ্রæপের আগের দাম ৭৫ টাকা হলেও এখন নেয়া হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। মনটিন ১০ এমজি একপাতা ২১০ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২৩০ টাকা। মনাস ১০ এমজি প্রতি বক্স ৪১৫ টাকার জায়গায় বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকায়। ওষুধের দোকানগুলোতেও এসব ওষুধের সংকট চলছে।

ফার্মেসি মালিকদের অভিযোগ, তারা ওষুধের সরবরাহই পাচ্ছেন কম। বিক্রয় প্রতিনিধিরাই বেশি দাম নিচ্ছেন দোকানিদের কাছ থেকে।

ওষুধের দোকান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক মো. আব্দুল হাই ইনকিলাবকে বলেন, কোম্পানি ওষুধের দাম বাড়ালে দোনকাদারদের কিছু করার থাকে না। তিনি বলেন, এখন ওষুধের দাম ঠিক করে কোম্পানি। পরে শুধু ভ্যাট নির্ধারণের জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে পাঠায়। তাই দাম নির্ধারণে ওষুধ প্রশাসনের কিছু করার থাকে না। মো. আব্দুল হাই বলেন, এক কোম্পানি বাড়ালে অন্যরাও বাড়িয়ে দেয় ওষুধের দাম। অজুহাত হিসেবে বলছে, সমন্বয় করা হয়েছে। এভাবে গত কয়েক বছর ধরে ওষুধের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, দাম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিক্রেতাদের সঙ্গে বাকবিতন্ডা থেকে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। অথচ কোম্পানি ঠিকই দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও মুখপাত্র মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হয়তো কেউ কেউ দামের ক্ষেত্রে অসাধু তৎপরতা চালাতে পারে। এগুলো আমাদের নজরে এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যা চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির চেয়ারম্যান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজির চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা রয়ে গেছে বিদ্যমান আইনের ভেতরে। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ এখনো কার্যকর থাকায় সেই পুরনো ব্যবস্থায় চলছে সব কিছু। এর সুযোগ নেয় অসাধু কোম্পানিগুলো। তিনি বলেন, এখন দেশে প্রায় এক হাজার ৩০০ জেনেরিকের ওষুধ রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে মাত্র ১১৭টির দাম সরকার নির্ধারণ করে দেয়। বাকি সব নির্ধারণ করে নিজ নিজ কোম্পানি। তারা নিজেরা দাম ঠিক করে শুধু সরকারকে একটু দেখিয়ে নেয়। ওষুধের ডোজের সঞ্চালন সাম্যতার ওপর নজর দেয়ার কথা বলেন এই বিশেষজ্ঞ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে ইনকিলাবকে বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আবার বাড়তি ওষুধ কিনে মজুদ করে রাখার কারণে প্রয়োজন আছে এমন রোগীও হয়তো সময়মতো ওষুধটি পাবেন না। এতে ওই ব্যক্তির জীবন রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই এসব বিষয় বিবেচনা করে প্রয়োজনের বেশি ওষুধ ক্রয় করা উচিত নয়।

জাহিদ মালেক বলেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে ইতোমধ্যে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় বাড়তি মূল্যে কেউ ওষুধ বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে অনেককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত