প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. শোয়েব সাঈদ : ধর্ষকামিতায় বাঙালি মানস

ভয়ংকর সব ত্রুটির সাথে আমাদের বসবাস। ত্রুটি আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়, ধর্মীয় শিক্ষায় আর সামাজিক আচার আচরণে। গলদ আছে আমাদের মন-মানসিকতার শেকড়ে। ধর্ষকামিতায় বাঙালি মানসকে উড়িয়ে দেবার সুযোগ নেই। নারী নির্যাতন আর ধর্ষণে বাঙ্গালির মুন্সিয়ানা বিরল কোন উপ্যাখ্যান নয়। মাথা নীচু করে চলা বাঙ্গালিদের স্বভাবজাত, প্রবাসের রাস্তাঘাটে এই দৃশ্য খুব কমন। অপরিচিত পশ্চিমাদের সাথে দেখা হলে হাসি বিনিময়ের সংখ্যা অনেক বেশী, বাঙালি মূলত মাথা নীচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। এর মধ্যে নিরীহ একটা ভাব থাকলেও, সময় সুযোগে বাঙালি নিরীহ নয়, তার প্রমাণ দেশে বিদেশে সর্বত্র। সময় সুযোগে নীরবে নিভৃতে বা দলবেঁধে ধর্ষণের অনেক কাহিনী যুগেযুগে আমাদের দেশে শহর, বন্দর, গ্রামে। দলবেঁধে বা মিছিল করে ধর্ষণ হচ্ছে উদ্ধত আর বেপরোয়া সমাজের চূড়ান্ত নষ্টামি। মন-মানসিকতার এই নীচুতার গবেষণাজাত তথ্য, উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিকারের কোন আয়োজন নিয়েও মাথাব্যাথা নেই এই সমাজের, ছিলনা কখনো। মন্দির, মসজিদে প্লাবিত একটি সমাজে সৃষ্টিকর্তার শাস্তির দৈনন্দিন হুশিয়ারীর মধ্যে থেকেও এই নির্লজ্জ অধপতনে আমার কিছু বিক্ষিপ্ত ভাবনা। আমার অভিজ্ঞতাজাত ভাবনার সাথে পাঠকদের ভাবনায় মিল থাকতেও পারে, নাও পারে।

১।এই প্রবাসে দেখছি যুগ যুগ ধরে অভিবাসী জীবন যাপন করে অর্থে, বয়সে আর প্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে এবং পশ্চিমা সভ্যতার উন্নত পরিবেশে থেকেও অনেকের মানমানসিকতা বাঁধা পরে আছে বাংলাদেশের মেয়েদের স্কুলের সামনে দাড়িয়ে থাকার টিনএজ বখাটেপনার চক্করে, বেরোতে পারছেনা মোটেও। গায়িকার গানে মুগ্ধ না হয়ে নজরটা দেহের দিকে, চমৎকার গাইছেন না বলে বলছে “মালটা খাসা”। প্রবাসে এই সব আচরণ দেখে মনে হয় ধর্ষকামিতায় বাঙালি মানসের শেকড় অনেক গভীরে, আমাদের সাধারণ আর ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বা সমাজ এই মানসিকতা পরিবর্তনে একেবারেই অক্ষম।

২।এদেশে বহু হুজুরদের বয়ানে মূল বিষয় নারী। ইউটিউবে কিছু ধর্মীয় বক্তাদের মেয়েদের নিয়ে আলোচনার নীচুতা মূলত মানসিকতাকেই বলাৎকার করে। মেয়েদের মর্যাদা আর অধিকারের প্রশ্নে ধর্মের নামে এই সব বিকৃত আলোচনায় প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র কোন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা নেই। উচিত হবে নারী বিদ্বেষের ঘৃণা যারা ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনা। ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগার ভয়ে এসব নষ্ট ধার্মিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ব্যর্থতা ধর্ম সমাজ উভয়কেই লাঞ্চিত করবে। জিন এডিট আর ব্ল্যাক হোল নিয়ে নোবেল পাবার যুগে নারী বিদ্বেষ জনিত কুৎসিত আলোচনা সমাজটাকে মূর্খতার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

৩।পাক-ভারতীয় উপমহাদের সংস্কৃতিতে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে বা একা পেলে উত্যক্ত করার মানসিকতা সবারই জানা। উত্যক্তকারীর পরিবার থেকে এর প্রতিরোধ না হলে সামাল দেওয়া কঠিন।

৪।সময় এসেছে স্কুল কলেজের কারিলুলামে এই সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে গঠনমূলক আলোচনা আর কঠিন পরিনতির বিষয়ে যত্নের সাথে পঠন। একে উপেক্ষা করার উপায় নেই। নারী-পুরুষের সম্পর্ক, অধিকার, মানবতা, ন্যায় অন্যায় নিয়ে আলোচনাটা খুব জরুরী। স্কুলে শিক্ষাটা সামাজিক আন্দোলনের চাইতেও শক্তিশালী।

৫।বাংলাদেশের মত দেশে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার দম্ভ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবার সবচেয়ে ভয়ংকর উপকরণ। এটি একটি জটিল সামাজিক সমীকরণ। নেতৃত্বের উপরের দিকে যারা থাকেন তাঁদের সদ ইচ্ছা ছাড়া, ক্যাডার পোষার ক্ষেত্রে নীতি নৈতিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড না মানা ছাড়া খুব বেশী অগ্রগতি হবার সুযোগ নেই। এই সব অপরাধে জিরো টলারেন্স হওয়া উচিত সততার সাথে ছলচাতুরীবিহীন।

৬। অর্থ বিত্ত সবকিছু অবৈধ দখলে নেবার মানসিকতায় বাঙ্গালি এগিয়ে। কি রাজনীতি, কি চাকুরী, কি ব্যবসায় সর্বত্র লুটপাট করার মানসিকতা এবং সেই মানসিকতার বৈধতায় প্রানান্তর চেষ্টা যুগে যুগে। বাঙালি চরিতের লোভ লালসা ইতিহাসের চাকাকে বার বার ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। নারীর সম্ভ্রম হরণে এই একই অবৈধ দখল মানসিকতাই দায়ী। নৈতিকতার কালেকটিভ অগ্রগতি ছাড়া এই দুষ্ট চক্র থেকে মুক্তি তো কঠিন। এর জন্যে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন।

৭। ভণ্ডামিতেও জুড়ি নেই আমাদের কি দেশে বা বিদেশে। সামাজিক স্তর উত্তরণেও অভিনয়, নষ্ট চিন্তা। সর্বত্র কৃত্রিমতায় বাড়াবাড়ি। প্রবাসে দেখছি মদের বোতল হাতে নিয়ে গলায় ঢালার আগেই মাতলামি শুরু হয়ে যায়। পশ্চিমাদের রুচিসম্মত ওয়াইন কালচারটাও শেখা হয়নি অনেকের ভণ্ডামি করতে গিয়ে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে ঢাকার অভিজাত এলাকায় যা ঘটে পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় শহরে এত সব বাড়াবাড়ি দেখা যায় না।

অতএব চিন্তা করুন ক্ষণকাল।

ফেসবুক থেকে।

সর্বাধিক পঠিত