প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই কেন সবকিছু সামলাতে হবে?

দীপক চৌধুরী: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হত্যা চেষ্টা, মেজর অব. সিনহা হত্যা, লবনের গুজব, পেঁয়াজের গুজব, চালের দাম বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের বাজারে গুজব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা, আবরার হত্যার পর বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) পরিস্থিতি, নুসরাত হত্যা, ক্যসিনোকাণ্ড, মানবপাচারকারী দুর্নীতিবাজ পাপলু এমপিকাণ্ড, করোনায় ভুয়া হাসপাতাল, কোভিড-১৯-এর জালিয়াতী রোগ পরীক্ষা অর্থাৎ সবকিছুই যেনো সামাল দিতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। স্বাস্থ্যের নুরানী চেহারার ড্রাইভারের কেলেঙ্কারী আলোচনা নতুন যোগ হয়েছে। মহাদুর্নীতিবাজের নাম আবদুল মালেক। তার নাকি সাতটি আধুনিক ফ্লাট আছে। মহাপরিচালকের গাড়ির চাবি তার পকেটে থাকে। মেয়ে, ভাতিজাসহ সাত জনকে চাকরিদাতা এই ড্রাইভার। আজব কথা শোনা গেল যে, কর্মকর্তারা লোকলজ্জার ভয়ে এসব বিষয় কখনও প্রকাশ করেননি। অধিদফতরের একজন গাড়ির চালক হয়েও মালেক একটি পাজেরো জিপ ব্যবহার করতেন। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের ক্যান্টিন তিনি পরিচালনা করেন। তার রয়েছে তেল চুরির সিন্ডিকেট, স্বাস্থ্য অধিদফতরের যত গাড়ির চালক তেল চুরি করে, তার একটি অংশ তাকে দিতে হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি পুরো অধিদফতর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন। স্বাস্থ্যের কেলেঙ্কারীর কথা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। কোবিড-১৯ এর কারণে এটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যের আবজাল কাহিনীও এখন আলোচিত। রিমান্ডে তিনটি দেশে টাকা পাচারের কথা স্বীকার আবজালের। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সাময়িক বরখাস্ত) আবজাল হোসেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচারের কথা স্বীকার করেছেন। দুদকের রিমান্ডে তিনি জানিয়েছেন, ৩ দেশে তার পাচার করা অর্থের পরিমাণ ৪১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এই ঘটনায় এক সময় ঝড় উঠেছিল। এখন মালেকের ড্রাইভারের কাহিনী সামনে চলে আসায় আমরা কিছুদিন এখানে হাবুডুবু খাবো।

কাভিড-১৯ মহামারী টেস্ট নিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার হোতা রিজেন্ট গ্রুপ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলার রায় ঘোষণার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। তার সীমাহীন দুর্নীতির তদন্ত চলছে। বিশেষত করোনা পরীক্ষায় ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণাসহ বিভিন্ন দুর্নীতির হোতা রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম এবং একইভাবে করোনাভাইরাস পরীক্ষার টেস্ট না করেই রিপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরী ও অন্যতম সহযোগী তার স্ত্রী জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মেজর অব. সিনহাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষের মধ্যে নানারকম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এমন ভয়ঙ্কর ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত হয়। তোফাঙ্গ চালিয়ে মানববধ বিস্মিত করার ঘটনা। কয়েকদিন গণমাধ্যমের প্রধান খবর ছিল এটি। পুলিশের ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও ওসি প্রদীপসহ একদল পুলিশ সদস্যের বিভিন্ন ‘ফুটেজ’ কয়েকদিন ঘনঘন দেখা যেত খবরে। এরপর দিনাজপুরের একটি উপজেলার ইউএনও ওয়াহিদা খানমকে হত্যা অপচেষ্টার খবরে শুরু হয় তোলপাড়।

আমরা লক্ষ্য করলাম- যেখানেই সংকট, যেখানেই অচলাবস্থা, যেখানেই সমস্যা সেখানেই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সামনে আনা হয়ে থাকে। তিনি তো সরকার প্রধান,দলপ্রধান। তাহলে এটা কেন? হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি সম্মুখে আসবেন। কখন? যখন আমরা নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে আর পারছি না কেবল তখনই। সবরকম কর্মকাণ্ডের ইস্যু প্রধানমন্ত্রীকে মাথায় নিতে হবে কেন- এ প্রশ্নতো সম্মুখে চলে এসেছে। সাধারণ মানুষের ঠোঁট চেপে ধরে রাখবেন কতক্ষণ? প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এতসব মন্ত্রীর দপ্তর কেন? দপ্তর-অধিদপ্তরের সংখ্যা কী কম? প্রশাসনের শাখা-প্রশাখা কী কম? কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা কী কম? রাজস্বের ক্ষেত্রে জনগণের কী কম টাকা দিতে হয়? তাহলে নিজেদের ওপর নির্ধারিত দায়িত্ব থাকার পরও অনেকেই কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখের দিকে চেয়ে থাকবেন? মুখটা নিজের দিকে একবার ঘুরিয়ে নেন। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করুন, ঝুঁকি নেন, মানুষের উপকার করেন, জনগণের খেদমত করেন। আপনি মন্ত্রী, আপনিতো বেতন নিচ্ছেন। পেঁয়াজ গুজব ছড়িয়ে মাত্র কয়েকদিনে একদল ব্যক্তির পকেট ভারি হয়েছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? জনগণের নাকি লোপাট ৪২৪ কোটি টাকা। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত ২৬ দিনে অসাধু সিন্ডিকেটটি ভোক্তার পকেট থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। তখন কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করলেও কঠিন ব্যবস্থা নিলে এটা হতো না। গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে একটি মহল। ৩০ টাকার পেয়াজ ২৫০ টাকা, ৩৫ টাকার লবন ১৫০ টাকা, ৩২ টাকার চাল ৪২ টাকা করেছে ওরা। সুতরাং কোনো ভাল জবাব নেই। আর কোনো জবাব দিয়েই কিন্তু সন্তুষ্ট করা অসম্ভব। এদেশে ষড়যন্ত্র হচ্ছে নানাভাবে এটা সত্য। লন্ডন থেকে ষড়যন্ত্র করা হয়। দেশি-বিদেশি চক্রান্ত নতুন নয়। তা তো কঠিন হাতে মোকাবেলা করতেই হবে। কিন্তু দেশে হাতের কাছে যারা? ওদের ধরা যায় না? শুধু আইন কঠোর হলেই হবে না, প্রয়োগ কঠোর হতে হবে। যার জন্য যে কাজটি প্রযোজ্য তাকেই সেটি করতে হবে। অন্যকে দিয়ে নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পেঁয়াজ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল। রমজানকে সামনে রেখে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলো। আগুন দাম। অবশেষে সেখানেও প্রধানমন্ত্রীকে হাত দিতে হলো, করতে হলো কঠিন সমস্যার সমাধান। জাতীয় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নাম গিনেজবুকে তোলার কথা বলেছিলেন একজন সাংসদ। কিন্তু জনগণের সঙ্গে ‘মশকরা’ করা ছাড়া কিছুই হয়নি।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের কথাই যদি বলি! এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছিল। প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়তেই কঠিন ব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অথচ এর আগে সবাই চুপচাপ। আত্মীয় হলেও আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকেও ছাড় দেননি শেখ হাসিনা। কয়েকজন রাজনৈতিক ‘বক্তৃতাবাজ’ মোটা অংকের চাঁদাবাজি করতেন এখান থেকে। গণমাধ্যমে ওদের নামধাম এসেছে। এখন এক বছর হয়ে গেছে। এক-তৃতীয়াংশ মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। কিছুদিন আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে’।

আওয়ামী যুবলীগের নতুন নেতৃত্বও কিন্তু পর্যবেক্ষণে। করোনায় অনেক কিছুই ধরা হচ্ছে না। নানাকথা কানে আসছে। অনেকেই ‘সুখানন্দে’ আছেন। কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। সুতরাং আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই।

আমরা ইচ্ছা করেই যেন, সকল সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি। এই প্র্যাকটিস দীর্ঘদিন ধরেই চলে এসেছে। আগের পিরিয়ডের চেয়ে যেন এখন বেশি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সরকার পরিচালনায় আমরা সহযোগিতা করবো। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই তাঁকে নিতে হয়। রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় অসাধারণ দক্ষ জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রকৃত অর্থেই দেশরত্ন। সুতরাং তাঁকে এতটুকু শান্তি দেওয়ার কথা আমরা ভাবছি না কেন? দেশিয় অনাকাঙ্ক্ষিত উটকো ঝামেলা সৃষ্টি করছি আর পরবর্তীকালে সেই ‘বোঝা’র সমাধান তাঁকে বের করতে হচ্ছে। এ কারণেই মানুষের মুখে প্রশ্ন, তাহলে সরকারে এতো এতো নির্দেশদাতা মানুষের কী দরকার? কী প্রয়োজন আছে এতো ‘মাথা’র?

লেখক: উপ-সম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

 

 

সর্বাধিক পঠিত