প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেবদুলাল মুন্না : হুমায়ুন আজাদ মৃত্যুকে কীভাবে দেখতেন?

দেবদুলাল মুন্না : শ্রীমঙ্গল থেকে ভাড়া করা একটি গাড়িতে ফিরছি। পেছনের সিটে আদিত্য কবির (এখন ইরেশ যাকেরের একটি ফার্মে [ইরেশের বাবা আলী যাকের ও মা সারা যাকের’এর প্রতিষ্ঠান] কাজ করতো না, তখন একটু বোহেমিয়ান। প্রথম আলোতে আহমদ ছফাকে নিয়ে কবিতা লেখেছে, (রাইসু সম্পাদক তখন), তো তার সাথে তখনকার আদালত প্রতিবেদক প্রকাশ বিশ্বাস, তারা গাড়ির পেছনের সিটে, এসে থামল ভৈরব ফেরিঘাটে। ড্রাইভারের পাশের সিট ফাঁকা ছিলো। পরের রো’তে আমরা দুজন। মানে আমি ও ড. আজাদ। ফেরিতে জ্যাম। এর আগে আমরা চারজনই সড়কপথে চা বাগান এলাকাগুলোতে গাড়ি থামিয়ে একটু দেখছিলাম। ফাঁকে ফাঁকে হাড়িয়া খাচ্ছিলাম এবং সেটি আদিত্য ও প্রকাশ (এখন বিডিনিউজে আছে) কে এভয়েড করে, যদিও তারা ছিলো আমাদের পানের আশায় পিছু পিছু। তো ফেরিঘাটে জ্যাম। নামলাম। আমি জানতাম আজাদের ককটেল ফিলোসফি। সার্ত্রে’র অস্তিত্ববাদ ও রাসেল। বললাম তাকে ‘চলেন, আপনি যখন বলেন, লাইফ মিনিংলেস বিগব্যাঙ টু মহাজাগতিক বিপর্যয়, তো আমরা সুইসাইড করি।’ তিনি জানতে চাইলেন আমি সাঁতার জানি কিনা? বললাম না জানার মতন। তিনি সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে বললেন, ‘মরা যাবে না। ’ কেন? প্রশ্ন আমার।

ততোক্ষণে ভৈরব ফেরি ঘাট থেকে আমাদের গাড়ি ঢাকা’র দিকে ছুটতে শুরু করেছে। বললেন, ‘শোনো, লাইফের কোনো উদ্দেশ্য নেই। এইমলেস। মিনিংলেস। লাইফ ইজ ডেড শিট। কিন্তু আমরা যদি সুইসাইড করি তখন লাইফ মিনিংফুল হয়ে উঠে। মানে আমরা জীবনকে গুরুত্ব দিলাম। আমরা জীবনকে কোনো গুরুত্ব দেবো না। মনে রেখো সাহিত্য, শিল্পকলা ধর্ম, সব জীবনকে অর্থবহ করার জন্য। দর্শন উত্তর খোঁজে। বোগাস। দর্শন আবারও উত্তর খোঁজে। সে ও বোহাস। রাজনীতি তোমার মনে হবে উত্তর দেবে, দিশা দেবে। কিন্তু সে ও আরও বড় ফাঁকি। জিততে জিততে হারবে। এসব ইতিহাস জয়ীদের। পরাজিতদের নয়। এনিমি হাজির হবেই তোমার সামনে। এটি হবে শক্তির ভরকেন্দ্রকে ঘিরে। তাই মতাদর্শ মানেই কারাগার। আমি কোনো কারাগার চাই না।’

ঢাকা পৌঁছার পথে আদিত্য আমাকে চুম্বন করতে থাকল বারবার। আজাদ উদাসীন ভাব নিয়ে থাকলেন। পরে ঢাকায় ভোরে তার বাসায় পৌছে দেওয়ার পথে তিনি বললেন, ‘রাবু (আদিত্যর আম্মা ) কে ফোন করে বলেছি- তোমার হাজবেন্ডের ( হুমায়ুন কবীর ) জন্য আমার নাম পাল্টালাম কিন্তু তোমার ছেলে যা কাণ্ড করলো।’ এটুকু বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আদিত্য পোস্ট মর্ডানিজম করে? আমি কোনো ইজমকেই মানি না।’ তাকে তার বাসায় পৌছে দেওয়ার পর আদিত্য তার আকাশে যেন ডিটারমাইণ্ডেড। শামসুননাহারেরর পাশেই তাদের বাসা। গেলাম। আজাদ ততোক্ষণে ল্যান্ডফোনে তার মাকে জানিয়েছেন সম্ভবত। কারণ আদিত্যের ওপর তার মায়ের ঝাড়ি। মহা বিরক্তি। আমি সোজা রাস্তায়। তখন সন্ধ্যার পর আবার রাত না। প্রকাশকে বিদায় দিয়ে শাহবাগে আজিজ মার্কেটে উকি দিলাম কী মনে করে। ছফা ভাই (আহমদ ছফা) নামছিলেন তার তিনতলার অফিস থেকে। নিচে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো আমি। দেখে কি মনে করে বললেন ‘কিছু খেয়েছো?’ উত্তর ‘না’। দুশ টাকা দিলেন এবং বললেন ‘এমত চেহারা নিয়া সামনে পড়িও না। যাও।’

তার মুখ থেকেও তখন বিদেশি মদের সুবাস। চিয়ার্স। তখন সুবাস মানেই অমিতাভ বচ্চনের মুকাদ্দর ক্য সিকান্দর। রেখা নাচছে। লাল টাই উড়ছে। আর রফিক আজাদের সেই কথাটি সাকুরার পথে যেতে যেতে, ‘লেখক মানেই চক্ষু সারাদিন ডালিম থাকবো।’

সর্বাধিক পঠিত