প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মারুফ কামাল খান: `জালিয়াতির কিসসা’ শিরোনামের ফেসবুক পোস্টটি প্রত্যাহার

মারুফ কামাল খান: হত্যামামলায় সম্প্রতি আটক পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাসকে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় পিপিএম পদক পরিয়ে দেয়া সংক্রান্ত একটি ছবি ভাইরাল হলে আমি এ নিয়ে ‘জালিয়াতির কিসসা’ শিরোনামে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিই। সঙ্গত কারণেই পোস্টটি ব্যাপক প্রচার পায় ও শেয়ার হয়।

পোস্টটিতে আমি যে সব তথ্য চ্যালেঞ্জ করি এবং নিজে থেকে যে সব তথ্য দিই তার কিছু কিছু তথ্যের ব্যাপারে অনেকে ব্যাখ্যা কিংবা নতুন তথ্য দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাতে আমি আমি নিজেও কিছুটা সন্দিহান হয়ে মনে করছি, আমার পোস্টটি আর প্রচারে থাকা উচিত নয়। কেননা কখনো কোনো তথ্য নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে সেটা প্রচার না করাই উচিৎ এবং সেটাই সততা ও নৈতিকতার দাবি।

সেই বিবেচনা থেকেই আমি ফেসবুকে আমার দেয়া ঐ পোস্টটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। এ প্রসংগে আমার ফেসবুক বন্ধুদের উদ্দেশে কিছু কথা আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই।

সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং অসত্য খণ্ডন ও বিভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে তরুণ বয়সেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিই। জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট, ঘাত-প্রতিঘাত সত্বেও সে উদ্দেশ্যের উপর অটল থাকার চেষ্টা করেছি সবসময়। হয়ত অনেক সময় অনেক ভুল করেছি কিন্তু কখনো জেনেবুঝে অন্যায় করিনি এবং মিথ্যার সাথে আপস না করার চেষ্টা সবসময় অব্যাহত রেখেছি।

রাজনীতি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও বিশ্বাস থাকলেও রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো কারণেই কখনো কোনো ধরণের অসত্য প্রচারের পক্ষে আমি নই। আমি যে পোস্টটি দিয়েছিলাম তার প্রতিটি বক্তব্য আমি সত্য বলে কনভিন্সড হয়েই লিখেছি।

বেগম খালেদা জিয়ার ছবি বলে প্রচারিত ফটোটি এডিট করা ও ফেক বলে আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করেছি এবং সেই বিশ্বাসের কারণগুলোও আমি যুক্তি সহকারে উল্লেখ করেছি। যাদের ওপর আস্থা রাখা যায় বলে মনে করি এমন বেশ কয়েকজন আমাকে জানিয়েছিলেন যে, তারা গোড়া থেকেই প্রদীপ দাসের সংগে চাকরি করে আসছেন। তারা নিশ্চিত করে বলেন, প্রদীপ বিএনপি সরকারের আমলে কোনো পদক পায়নি। কেউ কেউ প্রদীপ ১৯৯৬ সালে পুলিসে ঢোকে এবং বিপিএম ও পিপিএম উভয় পদক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে গ্রহন করে এইমর্মে প্রমাণ হিসেবে ইতোপূর্বে স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টও তারা আমাকে পাঠান।

তবে আমি বিএনপি আমলে প্রদীপ কোনো পদক পায়নি এবং ১৯৯৬ সালে চাকরি পেয়েছে – এই তথ্য নিশ্চিত না করে তা সরকারি ফাইল দেখে যাচাই করা যেতে পারে বলে আমার পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম। এখন পর্যন্ত কেউ সেভাবে বিষয়টি যাচাইয়ের পথে পা দেয়নি।

আমার পোস্টের মূল কথা ছিল খালেদা জিয়ার বলে প্রচার করা ছবিটি ফেক। এ ব্যাপারে আমার কিছু বন্ধু পাল্টা কিছু যুক্তির কথা আমাকে বলেছেন। তারা বলেছেন, এই ছবি সে সময়ে কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত না হলেও কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকতে পারে। ছবিতে যে স্মার্টফোন ক্যামেরার নাম উঠেছে সেটা ঐ সময়কার না হয়ে ফ্রেমে রাখা দুটি ফটো একই সংগে স্মার্ট সেলফোনের ক্যামেরায় এখন নেয়ার কারণেও উঠে থাকতে পারে। কেউ কেউ জানান, কালো বাক্সে ছাপমারা ছবিটি মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ব্যবহৃত প্রতীক বলে ভ্রম হলেও এটি আসলে পুলিশের মনোগ্রামের ছবি।

ছবিটি আমার হাতে নেই, কাজেই হাতে কলমে যাচাই করার সুযোগ নেই। এর ডিজিটাল ভার্সন দেখে এটিকে ফেক মনে করার পক্ষে আমি যে-সব যুক্তি দিয়েছিলাম বন্ধুদের পাল্টা যুক্তিগুলো আমার সে-সব যুক্তির ব্যাপারে কিছুটা হলেও কনফিউশন তৈরি করে। কাজেই যা নিয়ে কোনো ধরণের কনফিউশন থাকে তা প্রচার থেকে বিরত থাকাই উচিৎ বলে আমি মনে করি।

আমার পোস্ট সম্পর্কে ‘বুমবিডিডটকম’ নামের লোক্যাল একটি ফ্যাক্টচেকার সাইটও একটি প্রতিবেদন করেছে। এই সাইটটির আমি নাম আমি এর আগে কখনো শুনিনি। সেটা বড় কথা নয়। তারা ২০০৩ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখের দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সাত নম্বর পৃষ্ঠায় ‘যারা পুলিশ পদক পেলেন’ শিরোনামের একটি নিউজের ছবি দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০০৩ সালে বিতরণ করা পিপিএম পদকপ্রাপ্ত ২০ জনের নামের তালিকায় কক্সবাজারের চকোরিয়া থানার এসআই প্রদীপ কুমার দাশের নাম রয়েছে।

এই মুহূর্তে ইনকিলাব আর্কাইভ থেকে এই পেপার কাটিংটির সত্যাসত্য যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে বুম সাইট বলেছে প্রদীপকে পদক পরানোর ছবি কোনো পেপারে ছাপা হয়নি। তারা ২০০৩ সালে অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত পুলিশ পদক বিতরণের দুটি ছবিও দিয়েছে তাদের রিপোর্টের সঙ্গে। সে ছবি দুটির ফর্মেট অবশ্য প্রদীপকে বেগম জিয়ার পদক দেয়ার দৃশ্য বলে প্রচারিত ছবিটির ফর্মেট থেকে একটু আলাদাই মনে হয়। ফলে সেটি যে ফেক বা এডিট করা নয়, সে ব্যাপারেও কিন্তু নিশ্চিত হওয়া গেলোনা। তবুও কনফিশন সৃষ্টি হওয়ার কারণে আমার পোস্টটির প্রচার থেকে বিরত থাকা উচিত মনে করছি।

তবে বুম নামের এই সাইটটি আবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক কিছু বক্তব্যও দিয়েছে তাদের রিপোর্টে এবং আমি বলিনি এমন কিছু কথাও আমার কথা হিসেবে খণ্ডন করেছে। যা-হোক সেগুলির উল্লেখ করে গুরুত্ব বাড়ানো নিষ্প্রয়োজন মনে করছি। তাদের ভাষ্য ও ভাষাভঙ্গিই ফ্যাক্টচেকার হিসেবে বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট।

তবে পুলিসের একজন সাবেক কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন যে, প্রদীপ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার কাছ থেকে প্রথমে পিপিএম এবং পরে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম নিয়েছে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। তিনি আমাকে আরো জানিয়েছেন যে, পিপিএম পদক একাধিকবার পেলে তখন পদকপ্রাপ্তকে পিপিএম-বার বলা হয়। প্রদীপের নামের সাথে তিনি পিপিএম-বার উল্লেখ করতে দেখেছেন। কাজেই সে একাধিক বার পিপিএম পদক পেয়েছে। এর কোনোটি সে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে নিয়েছে কিনা তিনি সে ব্যাপারে নিশ্চিত করতে পারেননি।

যা হোক, আমার পোস্ট-এ ব্যক্ত অন্য সকল তথ্য ও বক্তব্য সঠিক থাকলেও কিছু তথ্যের ব্যাপারে কনফিউশন সৃষ্টি হওয়ায় আমি পোস্টটি প্রচার থেকে বিরত থাকছি। সেটি ‘অনলি মি’ করছি।

তবে প্রদীপের ক্রমাগত অপরাধ করে যাওয়া এবং লাগাতার অভিযোগ সত্বেও তা আমলে না নিয়ে আস্কারা দিয়ে যাওয়ায় সে যে ভয়ংকর অপরাধের দানব হয়ে উঠেছে সে সব ব্যাপারে আমার পোস্টের বক্তব্যের প্রতিটি বর্ণের প্রতি আমি দৃঢ়ভাবে অটল রয়েছি। তার অত্যাচার-অনাচারের শিকার প্রতিটি মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করে ক্ষমতাসীনদের তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। পুলিশকে অন্যায় ও বাড়াবাড়ির খোলা ছাড়পত্র দিয়ে জনগণকে ত্রাসের মুখে দাবিয়ে রেখে অনৈতিক ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে আমার দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছি। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ভয়ংকর পরিণতির কথাও আবারো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।

আমি দুঃখিত আমার ভুল এবং অনুধাবনতা ও যুক্তির সীমাবদ্ধতায় কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকলে। কেউ ভুলের উর্ধে নয়। তবে সকলের মধ্যে ভুল স্বীকারের সততা ও সৎসাহসটা থাকলে আমাদের ভুলগুলোও ফুল হয়ে ফুটে উঠতে পারে। ধন্যবাদ সকলকে। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত