প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দা ছুরি বঁটি চাপাতি বিক্রি : কামারপট্টিতে শেষ সময়েও দেখা নেই ক্রেতার

ডেস্ক রিপোর্ট : রাত পোহালেই খুশির ঈদ। করোনা ভাইরাসের বিরূপ বাস্তবতায় আগামীকাল শনিবার সারা দেশে উদযাপন হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। কোরবানির এই ঈদে মুসলমানরা তাদের সাধ্যমত পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। আর সেক্ষেত্রে পশু জবাইয়ে প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে দা, ছুরি, বঁটি, চাপাতি। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে গেল কিছুদিন ধরেই কামার-কারিগরদের ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে।

রাজধানীর কামারপট্টিগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সবখানে এখনও টুংটাং আর হাঁসফাঁস শব্দে সরগরম। আগুনের লেলিহান শিখায় লোহাকে পুড়িয়ে দা, ছুরি, বঁটি, চাপাতি তৈরিতে শেষ সময়েও ব্যস্ত কামাররা। লক্ষ্য একটাই, চাহিদা মত গ্রাহকের হাতে পণ্য তুলে দেয়া।

সরেজমিনে কারওয়ান বাজার কামারপট্টি ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানেই হাপরের হাঁসফাঁস আর হাতুড়ি পেটানো টুংটাং শব্দ। লোহায় হাতুড়ি পেটায় ছড়াচ্ছে স্ফূলিঙ্গ। দিন-রাত অবিরামভাবে কোরাবানির মাংস কাটার সরঞ্জাম তৈরি কাজ চলছে। এক মুহূর্ত দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না কামাররা।

তাদের সঙ্গে কথা হলে জানান, বছরের ১১ মাসে তাদের ব্যবসা হয় এক রকম আর কোরবানির ঈদের আগের এক মাসে ব্যবসা হয় আরেক রকম। সারা বছরের মোট ব্যবসার সিংহভাগই হয়ে থাকে কোরবানির ঈদের সময়। তাই এসময় তাদের ব্যস্ততা থাকে অনেক। অতিরিক্ত কারিগর দিয়েও কাজ করতে হয়।

কথা বলে জানা যায়, স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা ব্যবহার করে এসব উপকরণ তৈরি করা হয়। পাকা লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভালো, দামও বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়াও এঙ্গেল, ব্ল্যাকবার, রড, স্টিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাত দিয়েও তৈরি করা হয় দা, ছুরি, বঁটি, চাপাতি।

কোরবানির ঈদ ঘিরে কামার শিল্পীদের লৌহ পেটানোর টুংটাং আর হাঁসফাঁস শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে রাজধানীর কামারপল্লীগুলো। দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা। লোহার তৈরি নতুন দা, চাপাতি, ছুরি তৈরির পাশাপাশি চলছে পুরনোগুলোতে শাণ দেয়ার কাজ। এছাড়া কুড়াল, বেছি ও কাটারি বানাতেও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা। বিরামহীনভাবে জ্বলছে কামার দোকানের চুলার আগুন।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কাপ্তান বাজার, কাওরানবাজার কামার পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে টুংটাং শব্দ। কেউ ভারি হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন দগদগে লাল লোহার খণ্ড, আবার কেউ শাণ দিচ্ছেন ছুরি কিংবা বঁটি, কেউবা কয়লার আগুনে বাতাস দিচ্ছেন। কোরবানির সময় তাদের আয় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তাই সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকেন তারা।

যাত্রাবাড়ীর কামার পাড়ার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের অন্য সময় বিল্ডিং তৈরির হ্যান্ডেল, হাতুড়িসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে তারা ব্যস্ত থাকলেও কোরবানির ঈদ ঘিরে মাসখানেক আগে থেকেই পশু জবাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়।

রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় প্রায় ৫০ টির মতো কামারের দোকান আছে। প্রতি দোকানে কারিগর গড়ে চার থেকে পাচ জন কাজ করে। তবে ঈদের সময় প্রতি দোকানেই রাখা হয়েছে বাড়তি কারিগর।

দোকানিরা জানান, ঈদের সময় তাদের বেচাবিক্রি ভালো হয়। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ক্রেতারা ঝুঁকি নিয়ে আসতে চাচ্ছেন না। ঘরে থাকা আগে ছুরি-চাপাতি দিয়েই অনেকে কোরবানির কাজ চালিয়ে নিতে চাইছে।

কোরবানি ঘিরে কামারপল্লীতে সাধারণত ৫ ধরনের বঁটি, ৬ রকমের দা, ১৬ ধরনের ছুরি, ৭ ধরনের কাবাব ছুরি, ২০ ধরনের চাপাতি, ১২ ধরনের জবাই ছুরি তৈরি করেন। এছাড়া কুঠার ও ধার দেয়ার জন্য এক ধরনের স্টিকও বিক্রি করেন।

এ বছর প্রকারভেদে বঁটির দাম ৪০০ থেকে সাড়ে ৪৫০ টাকা, গরু জবাইয়ের ছুরি ৫০০ থেকে ১৮০০, চাপাতি ৬০০ থেকে ২০০০, কাবাব চুরি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া অন্যান্য ছুরি ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কুঠার সাধারণত কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদ মৌসুমে প্রতিটি ছুরি-চাকু-চাপাতির দাম কিছুটা বেড়েছে।

যাত্রাবাড়ীর এক কারিগর বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে কোরবানি ঈদ এলে আমাদের কাজের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এসময় দিনরাত একটানা কাজ করতে হয়। ক্রেতাদেরও কমতি থাকে না। একটু বেশি আয়ের উদ্দেশ্যে দিনরাত এমন পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু এবার করোনার কারণে ব্যবসা কিছুটা কম।’

আরেক কারিগর বলেন, ‘ঈদ ঘিরে সময়টা অনেক ব্যস্ত কাটছে। কিন্তু সারা বছর স্বল্প আয়ে আমরা কিভাবে পরিবার নিয়ে চলি, তা জানার কেউ নেই। সারা দিনে মহাজনের ৫০০ টাকা রুজি হলে আমরা তার থেকে কত টাকাইবা পেয়ে থাকি। এই দুঃখ কাকেই আর বলবো। এবার করোনা ভাইরাসের কারণে বেচাকেনা আগের বছরের চেয়ে কম।’

এদিকে কোরবানি ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতেও এখন ভ্যানে করে দা, ছুরি, বঁটি, চাপাতিসহ কোরবানির মাংস কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি করছেন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা। তারাও বলছেন, এ বছর অন্যান্য ঈদের চেয়ে বেচাকেনা কম। ক্রেতাদের ভিড় নেই। চারপাশে করোনার আতঙ্ক। অনেকেই ঘরে থাকা ছুরি-চাকু দিয়ে এবার পশু কোরবানি করবেন।

ব্রেকিংনিউজ

সর্বাধিক পঠিত