প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয়ে ছাড়িয়ে নেন ১৭ অটোরিকশা

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] চট্টগ্রামে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক ১৭টি নম্বরবিহীন সিএনজি অটোরিকশা ছাড়াতে পুলিশের কাছে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে ফোন করেছিলেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। এ ফোন পেয়ে পুলিশ ১৬টি গাড়ি তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেয়। তিন মাস পর চট্টগ্রামে এসে অবশিষ্ট গাড়িটিও ছাড়িয়ে নেন তিনি। গাড়িগুলো আটকের কারণে অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশ সিকিউরিটি সেলে অভিযোগ দেন। তাতে দুই পুলিশের শাস্তিও হয়। দুজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর কাগজপত্র না থাকায় চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল কর্নফুলী উপজেলার খোয়াজনগর ‘মেগা মোটরস’-এর গুদাম থেকে ১৭টি সিএনজি

[৩] অটোরিকশা আটক করে শহরে নিয়ে আসে। ডিবি পুলিশের তৎকালীন এডিসি হুমায়ুন কবির এ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। অংশ নেন দুই এসআই, দুই এএসআই ও আরও কিছু পুলিশ সদস্য।

ওই রাতেই শাহেদ করিম, তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জনসংযোগ শাখার এক কর্মকর্তা এসব গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্যকে ফোন করেন। পুলিশকে ফোন করার সময় শাহেদ করিম নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দাবি করেন। এ ধরনের অতি উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ১৬টি সিএনজি অটোরিকশা ও সেই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের গাড়ির মালিক জিয়া উদ্দিন মো. জাহাঙ্গীরের ভায়রা অ্যাডভোকেট শাহেদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। একটি অটোরিকশা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নমুনা হিসেবে মনছুরাবাদ গোয়েন্দা কার্যালয়ে রাখা হয়। ‘প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা’র ফোন পেয়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পুুরো বিষয়টি প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়।

[৪] বিআরটিএ নমুনা গাড়িটি পরীক্ষা করে দেখতে পায়, ওই সিএনজি অটোরিকশার ইঞ্জিন ও চেসিসের নম্বরের মধ্যে কোনো ধরনের মিল নেই। এই ঘটনাকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে বিআরটিএ এই গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষার সুপারিশ করে। বিআরটিএ মতামত দেয় আলাদাভাবে বিদেশ থেকে পার্টস কিনে এনে দেশে গাড়িগুলো তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এজন্য এসব গাড়ি আমদানির কাগজপত্র ও কাস্টমসে খোঁজ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এসব তদন্তের মধ্যেই তিন মাস পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শাহেদ করিম সশরীরে চট্টগ্রাম আসেন। তিনি দেখা করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্যের সঙ্গে। শাহেদ করিম আবারও নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দেন এবং বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘মাত্র একটি সিএনজি অটোরিকশা ছাড়িয়ে নিতে আমাকে চট্টগ্রাম আসতে হলো।’

[৫] এ সময় অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমাদের পুলিশ সিকিউরিটি সেল আমার হাতের মুঠোয়। তোমাদের আমি ছাড়ব না। এ ঘটনার পর সিএনজি অটোরিকশাগুলোর আমদানিকারক জিয়া উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে দিয়ে পুলিশ সিকিউরিটি সেলে একটি অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া হয় অভিযানে অংশ নেওয়া এএসআই আজমীর ও এএসআই সাদেককে। তৎকালীন এসআই আফতাব ও রাজেশ বড়–য়ার বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।

পাশাপাশি বিআরটিএ থেকে গাড়িগুলোর বিপরীতে দেখানো কাগজপত্রগুলো ভুয়া বলে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে গাড়িগুলোর পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এমনকি বিআরটিএ গাড়িগুলোর আমদানির কাগজপত্র ও কাস্টমসসহ বিস্তারিত তদন্তের সুপারিশ করলেও শাহেদ করিমের ভয়ে তা আর এগোয়নি।

[৬] গত সোমবার নগরীর ডবলমুরিং থানায় শাহেদ করিমের বিরুদ্ধে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন এই ১৭ সিএনজি অটোরিকশার মালিক জিয়াউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের পক্ষে তার চাচাতো ভাই সাইফুদ্দিন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ঢাকা শহরে থ্রি হুইলার গাড়ি চালাতে বিআরটিএর কাগজপত্র নিয়ে দেওয়ার নামে ৫৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং নগদ ৩২ লাখ টাকা শাহেদ করিমকে দেওয়া হয়। শাহেদ করিম এর বিনিময়ে যে কাগজপত্র দেন, তা ভুয়া বলে প্রমাণ হয়। এ মামলায় জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন মেগা মোটরসের সাবেক ব্যবস্থাপক শহীদুল্লাহকেও আসামি করা হয়।

মামলার বাদী সাইফুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশ আনোয়ারায় আমাদের গুদাম থেকে ১৭টি গাড়ি নিয়ে আসে। তখন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী জাবেদ সাহেব ও শাহেদুল করিম পুলিশকে ফোন করেন। এর পর পুলিশ গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়। তিনি বলেন, শাহেদ করিমের সঙ্গে তখন আমাদের লেনদেন হয়নি। আমাদের ম্যানেজার শহীদুল্লাহর মাধ্যমে ঢাকায় শাহেদ করিমের সঙ্গে পরিচয় হয়। এর পর লেনদেন হয়। সাইফুদ্দিন দাবি করেন, শাহেদ করিম অনেকটা নিজে থেকেই পুলিশকে ফোন করে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিচয় দেন। তার কথায় পুলিশ গাড়িগুলো ছেড়ে দিলে আমরা বিশ্বাস করে ঢাকা বিআরটিএ থেকে কাগজ বের করতে পরবর্তীতে ৯১ লাখ টাকা দিই।

[৭] বিষয়টি জানার জন্য বর্তমানে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৭ সালের বিষয় এখন অতো মনে নেই। সিএনজি অটোরিকশা ছাড়ার কথা জানি। তবে শাহেদ করিম নামে কারও ফোনের কথা এখন আর আমার মনে পড়ছে না।

তবে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) হুমায়ুন কবির বলেন, ভুয়া কাগজপত্রের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে আমরা গাড়িগুলো আটক করেছিলাম। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়। ফেরত দেওয়া সাপেক্ষে ১৭ সিএনজি অটোরিকশার মধ্যে ১৬টিই ছেড়ে দেওয়া হয়।যুগান্তর, প্রিয়ডটকম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত