প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মুড়ির টিন ও মোমিন কোম্পানির বাস

ইসমাঈল হুসাইন ইমু : [২] চল্লিশের দশক থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় খুবই জনপ্রিয় গণ পরিবহন ছিল মোমিন কোম্পানির বাস। এই বাসগুলো মজবুত হলেও নাম ছিল মুড়ির টিন। মুড়ির টিন নামকরণ কেন হলো তার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও ধারণা করা হয় বাসের আকৃতির কারণে এমন নামকরণ করা হয়।

[৩] এই বাসগুলো কাঠের বডি, কাঠের বডির ওপর পাতলা টিন দিয়ে মোড়ানো হতো। চালকের ছিল আলাদা কেবিন। পাশে এক দুই জন যাত্রী বসানো যেত।এই বাসগুলো সেলফ স্টার্ট বা এখনকার গাড়ির মতো চাবি ঘুড়িয়ে স্টার্ট করা যেত না। বাংলা ‘ দ ‘ আকৃতির একটি লোহার দণ্ডের এক মাথা ইঞ্জিনে প্রবেশ করিয়ে জোরে ঘুড়িয়ে স্টার্ট দেয়া হতো। বাসে ছিল না কোনো ইলেকট্রনিক বা হাইড্রোলিক হর্ন। ড্রাইভারের ডান পাশে দরজার সাথে ভেপু বা হর্ন ছিল। ড্রাইভার হাত দিয়ে চেপে এই হর্ন বাজাতো। মুড়ির টিনের পাশাপাশি এই বাসগুলোকে মোমিন কোম্পানির বাস বলা হতো।

[৪] পুরনো ঢাকার উর্দু রোডের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন আব্দুর রহমান। ছিলেন অঢেল সম্পত্তির মালিক। তার দুই ছেলে আব্দুল আজিজ এবং আব্দুস সাত্তার। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট আব্দুস সাত্তার ছিলেন তখনকার নাম করা ওষুধ কোম্পানি ফার্মাদেশ এবং হোটেল পূর্বাণীর মালিক। ফার্মাদেশ ওষুধ কোম্পানির ফ্যাক্টরি ছিল (এখনো আছে) তেজগাঁও শিল্প এলাকা। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় বর্তমানে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বলতে যেমন নাপা বোঝায় সেসময় প্যারাসিটামল বলতে ফার্মাদেশের ইরামিন ট্যাবলেট এবং সিরাপ চিনতো। হেড অফিস সেগুন বাগিচা।

[৫] অষ্টাশি সালে সাত্তার সাহেবের সাথে আলাপ হয় সেগুন বাগিচায় ফার্মাদেশ অফিসে। আলাপের ব্যবস্থা করে দেন বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান ফার্মাদেশের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম (বর্তমানে পরিচালক হামদার্দ) আলাপ চারিতায় সাত্তার সাহেব বলেন চল্লিশের দশকে তারা ইংল্যান্ড থেকে বেডফোর্ড গাড়ি আমদানি করেন। ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মাণ করেন গ্যারেজ। নাম দেয়া হয় মোমিন মোটর কোম্পানি। লোকজন বলতো মোমিন কোম্পানি।

[৬] মোমিন নামটি নেয়ার কারণ হলো এটি আরবী শব্দ। যার অর্থ ঈমান বা বিশ্বাস নেকী। মোমিন নামে তাদের পরিবারে কেউ ছিল না। তারা প্রথম রামপুরা টু সদরঘাট রুটে সার্ভিস শুরু করে।

[৭] এরপর সদরঘাট টু চকবাজার। গুলিস্তান টু চকবাজার রুট চালু করে। সেসময় ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল চকবাজার, শ্যামবাজার, বাবুবাজার নয়াবাজার এবং বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরা এবং রুহিতপুর। একই সাথে বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওই এলাকা।

[৮] গুলিস্তান, মানসী বা নিশাত, নাগরমহল, আজাদ, রূপমহল, লায়ন, শাবিস্তান সিনেমা হলগুলো ছিল পাশাপাশি। এই বাসে চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে সিনেমাপ্রেমিরা আসা যাওয়া করতেন। তখন মোমিন কোম্পানির বাস ছিল যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। চলতো কচ্ছপ গতিতে। পরবর্তীতে শীতলক্ষ্যার ওপার বাস সার্ভিস চালু করা হয়।

[৯] ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাছ থেকে জায়গা লীজ নিয়ে নিজেদের খরচে রাস্তা নির্মাণ করে তারাবো থেকে বাবুরহাট, নরসিংদী মুড়ির টিন চলতো। এরপর জিঞ্জিরা থেকে রুহিতপুর রুট চালু করা হয় । কারণ হিসেবে সাত্তার সাহেব বলেন নরসিংদী, রুপগঞ্জ, তারাবো ছিল তাত শিল্প এলাকা।

[১০] একই ভাবে রুহিতপুরও ছিল তাত শিল্প এলাকা। সারা দেশে তাত শিল্প এবং তাঁতের কাপড়ের প্রসারের জন্য তারা নিজ খরচে রাস্তা নির্মাণ করে বাস সার্ভিস চালু করে। সত্তর দশক পর্যন্ত রাজধানীতে মুড়ির টিন চলতো। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত জিঞ্জিরা টু রুহিতপুর রুটে কয়েকটি মুড়ির টিন চলতো। এখন সবই স্মৃতি। লেখাটি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি এস এম আবুল হোসেনের ফেসবুক স্টাটাস থেকে নেয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত