প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] অগ্নিনিরাপত্তায় উদাসীনতা : ৪৩৩ হাসপাতাল আগুন ঝুঁকিতে

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকার ৪৩৩টি হাসপাতাল। এই তথ্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের। এই তালিকা থেকে সংস্থাটি ১৭৪টিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ২৪৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে ২০১৭ সালে।

[৩] ওই সময়ে হাসপাতালগুলোকে অগ্নিঝুঁকিমুক্ত করতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ৩০ দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়। ১৫টি পরিদর্শন দল গঠন করা হয়। দলগুলো কী রিপোর্ট দিয়েছে তা কেউ জানে না। হাসপাতালগুলো এই সতর্কতায় কোনো গুরুত্বারোপ করেনি।

[৪] ফলে সম্প্রতি দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল ও অভিজাতদের সেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে গত ২৮ মে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৫ জন রোগীর প্রাণহানি হয়।

[৫] এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কোনো হতাহত না হলেও ব্যাপক আকারে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনির্বাপণে কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে তা জানতে চায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

[৬] এছাড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোকে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া আয়োজনেরও নির্দেশনা দেয়া হয়। এমনকি ওই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেও হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার জোরদারের নির্দেশনা দেন। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতাল এ ধরনের নির্দেশনায় গুরুত্বারোপ করেনি। ফলে গত বছরের মে মাসে পুরান ঢাকার সালাহউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।

[৭] খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর, শুধু ওই হাসপাতাল ছাড়া রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণে সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে বলা হলেও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল এসব নির্দেশনার প্রতি উদাসীন থাকায় স্বল্প বিরতিতেই কোনো কোনো হাসপাতালে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটছে।

[৮] ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর রাজধানীর সব হাসপাতালের প্রতিনিধি নিয়ে সভা করা হয়। সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও ছিল। এরপর আরও তিন দফা নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু কেউই গুরুত্ব দেয়নি।

[৯] এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান বলেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার পর রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়। পাশাপাশি সবাইকে সঠিকভাবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে বলা হয়।

[১০] সম্প্রতি ইউনাইটেড হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সিটিংগুইশার পাওয়া গেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিগগিরই সব হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

[১১] প্রায় তিন বছর আগে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি মিলে ৪ শতাধিক হাসপাতালকে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডে জুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁপিূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। চিহ্নিত এসব হাসপাতালকে মৌখিকভাবে সতর্ক করার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ চিঠি দেয় ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।

[১২] সেই চিঠিতে বলা হয়, হাসপাতালগুলো যদি সমস্যার দ্রুত সমাধান না করে, তাহলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হতে পারে, ঘটতে পারে ব্যাপক হতাহত ও প্রাণহানির ঘটনা।

[১৩] ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা জানান, দুই-একদিনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষকে পুনরায় সতর্ক করা হবে। তবে এক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

[১৪] স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের রাজধানীর প্রায় সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতালগুলোতে নেই পর্যাপ্ত খোলামেলা স্থান, জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা, বিকল্প সিঁড়ি। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। আবার অনেক হাসপাতাল নিয়মনীতি ছাড়া আবাসিক ভবনেই গড়ে উঠেছে।

[১৫] এদিকে বুধবার রাত পৌনে ১০টায় ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই আগুনে পাঁচজন রোগী মারা যান। তারা হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে ছিলেন। পাঁচজনের মধ্যে চারজন পুরুষ ও একজন নারী।

[১৬] নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মনির হোসেন (৭৫), ভেরন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৫০)। তাদের মধ্যে প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দুজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারা রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন। তারা সবাই অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিলেন।

[১৭] অগ্নিকাণ্ডের পরদিন বিকালে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, রোগীরা সবাই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তবে তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

[১৮] ইউনাইটেডের করোনা ইউনিটে ছিল না অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস থেকেও এই বর্ধিত অংশের অনুমোদন নেয়া হয়নি। হাসপাতালের ভেতরে মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সিটিংগুইশার ছিল। তবে সেগুলো কেউ ব্যবহার করেনি। অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে এসব তথ্য পায় ফায়ার সার্ভিস।

[১৯] গত বছর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা জানার পর দেশের সব হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৫টি পৃথক পরিদর্শন দল গঠন করে।

[২০] মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দলটি গঠন করা হয়। যারা সারা দেশের সব হাসপাতাল পরিদর্শন করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ঝুঁকি মোকাবেলা সম্পর্কে খোঁজখবর নেবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে সুপারিশ করবে। যদি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কারও দায়িত্বে অবহেলা বা ত্রুটি ধরা পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পরিদর্শন দল। তবে সেই ১৫টি দল কতটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল তার কোনো তথ্য কেউ জানাতে পারেনি।

[২১] এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আমিনুল হাসান বলেন, সোহরাওয়ার্দীর অগ্নিকাণ্ডের পর সব হাসপাতালকে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা জানায়নি। ফলে হাসপাতালগুলোর সর্বশেষ তথ্য তার কাছে নেই। তবে চলতি সপ্তাহে আবারও সব হাসপাতালে সতর্কতামূলক চিঠি দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

[২২] ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পর ঢাকাকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে সব ধরনের স্থাপনা পরিদর্শনে নামে সংস্থাটি। সেই সময় ঢাকার মোট ৪৩৩টি হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের তালিকা করে তারা। ওই তালিকায় ঢাকার ৪২২টি হাসপাতালকে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে ২৪৮টি হাসপাতালকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৭৪টি হাসপাতাল অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর ফায়ার সার্ভিসের সার্বিক বিবেচনায় সন্তোষজনক অবস্থানে ছিল মাত্র ১১টি হাসপাতাল।

[২৩] সংস্থাটির দেয়া তথ্যমতে, আইন অনুযায়ী ৩০টির বেশি ব্যবস্থা রেখে ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ফ্যাক্টরির অবস্থান, ব্যবহৃত ফ্লোরের আয়তন, ভবনের সাধারণ সিঁড়ির প্রশস্ততা, অগ্নিনির্বাপণ কাজে সিঁড়ির ব্যবস্থা, জরুরি প্রস্থানের সিঁড়ির সংখ্যা ও প্রশস্ততা নির্ধারণ; প্রতি তলায় সেফটি লবির ব্যবস্থা রাখা; জরুরি বহির্গমন পথ মার্কিং ও ভবনের ছাদ টিনশেড কিনা তা যাচাই করা; ছাদে ওঠার সিঁড়ি সংখ্যা ও প্রশস্ততার দিকে নজর রাখা; ছাদের দরজা খোলা ও ভবনের বহির্গমন দরজার ব্যবস্থা রাখা; আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংক (৫০ হাজার গ্যালন) রাখা; ১০ হাজার গ্যালনের ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংক থাকা, বৈদ্যুতিক তারের কনসিল ওয়্যারিং থাকা; বৈদ্যুতিক বোর্ডের প্রধান সুইচ বক্স, সুইচ বক্স জংশন বক্স এবং ডিমান্ড বক্স নিরাপদ অবস্থানে রাখা; প্রতি ফ্লোরে এবং কক্ষে সার্কিটব্রেকার রাখা; কর্মচারীদের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারে প্রশিক্ষণ থাকা এবং সিঁড়িসহ সব পথ বাধামুক্ত রাখা। কিন্তু এসব শর্ত না মেনেই বছরের পর বছর ধরে অধিকাংশ হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত