প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভার্চুয়াল আদালত সিস্টেম: প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জসমূহ

সাকিল আহমাদ: মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ বা যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় প্রদানকালে মামলার পক্ষগণের ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আদালতকে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে শনিবার “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০” জারি করা হয়েছে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে এই অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশটি মাত্র ৫টি ধারা সম্বলিত হলেও এটার মর্মার্থ ও গভীরতা ব্যাপক। এটি জারির মাধ্যমে বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজড করার দীর্ঘদিনের আলোচনা একটি আইনগত ভিত্তিতে দাঁড়ালো। সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে রাষ্ট্র্রের এই উদ্যোগ প্রসংশার দারি রাখে। তবে ডিজিটাল বিচার বিভাগ করার লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশের পূর্ণ কার্যকর ও ফল পেতে রাষ্ট্র ও আইনজীবীদেরকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রাথমিকভাবে অনলাইনে কোন আসামির জামিন শুনানি ও বেইল বন্ড দাখিল করার সিস্টেম রাখা হয়েছে। শুরুতে হয়তো প্রতিটি জেলায় দুই-একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ভার্চুয়াল সিস্টেমে জামিন শুনানি ও বেইল বন্ড দাখিলের ব্যবস্থা রাখা হবে। তবে প্রতিটি জেলার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এখনো কম্পিউটারসহ অনলাইনে শুনানি করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। ই-জুডিসিয়ারির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ই-পুলিশিং সিস্টেম। কারণ থানায় লিপিবদ্ধ এজাহার, এফআইআর এর কপি ও প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনলাইনে দাখিল করা না হলে আদালত কোনভাবেই জামিন শুনানি করতে পারবে না। তাই প্রোডাকশন মামলায় জামিন শুনানি করার বিষয়টি শুরুর দিকে বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে। একইসঙ্গে আত্মসমর্পণের কোন আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে জেলহাজতে পাঠানো হলে সেটা কিভাবে কার্যকর করা হবে, সেটাও ভাববার দাবি রাখে।

হাজতী আসামির ক্ষেত্রে তাকে হাজির করা ছাড়াই জামিন শুনানি করে আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর তার মুক্তির আদেশ ই-মেইলে জেল কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে মর্মে সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি দিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে। তবে ভার্চুয়াল শুনানি করে জামিন পাওয়ার পর সিস্টেমের কারণে আদেশ কারাগারে পাঠানোয় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আইনজীবীদেরকেও কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। কারণ জেলা আদালতের বড় সংখ্যক আইনজীবীগণ এখনো ভার্চুয়াল সিস্টেমের সাথে ততটা পরিচিত নন। এক্ষেত্রে শিক্ষাণবীশ আইনজীবীদের কোন কাজ থাকবে কি না সেটা নিয়েও মাথা ঘামাতে হবে।

তবে আশার দিক হলো, যেসব ফৌজদারী মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা বছরের পর বছর ধরে অফিসিয়াল কাজ, সময় না পাওয়া বা অন্য কোন কারণ দেখিয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারে না, সেগুলো এখন অনলাইনে সময়ক্ষেপণ না করে গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে সিআর মামলাতেও অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে করা সময় আবেদন মঞ্জুর না করে ভার্চুয়ালি হাজিরার মাধ্যমে শুনানি করা যাবে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে মামলার রায় পেতে সাহায্য করবে। যাতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং মামলাজট অনেকাংশে কমবে বলেও আশা করা যায়।

এ বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিধি তৈরি করে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের কর্মকান্ডে সহায়ক হয়ে বিচার বিভাগের কাজে নতুন এই আইন গতি সৃষ্টি করবে বলেও প্রত্যাশা রইলো।

২০১৬ সালে সিলেট জেলা আদালতে প্র্রথম ‘ডিজিটাল উইটনেস ডিপোজিশন সিস্টেম’ চালুর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ ডিজিটালের ছোয়া পায়। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল জেলায় ডিজিটাল কোর্ট রুম স্থাপন ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যেটা ২০২১ সালের মধ্যে হওয়ার কথা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থাতেও ডিজিটাল সিস্টেমে শুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ ও নথিপত্র সংরক্ষণে নজির স্থাপন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: অ্যাডভোকেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত