প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাসুলের (সা:) কাছ থেকে যেভাবে কোয়ারেন্টাইন শুরু হয়েছিল

আহসান হাবিব : কোয়ারেন্টিনের তাত্ত্বিক ধারণা প্রথম পাওয়া যায় রাসুলের (সা:) কাছ থেকেই। তিনিই প্রথম বলে যান, কোনো এলাকা মহামারিতে আক্রান্ত হলে সেখানে বাহির থেকে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। আবার আক্রান্ত এলাকা থেকেও কেউ বের হতে পারবে না। আল্লাহর রাসুলের (সা:) এ নির্দেশনা আমওয়াসের প্লেগের সময় তৎকালীন খলিফা হযরত উমর (রা.) এবং আমওয়াসের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুসলিম সেনাপতি ও আশারায়ে মুবাশশারাহ আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) যথাযথভাবে পালন করেন। হযরত উমর (রা.) প্লেগের খবর পাওয়ার পর আক্রান্ত এলাকায় যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে, আবু উবাইদাসহ (রা.) কয়েক হাজার সাহাবি আমওয়াসে থাকা অবস্থায় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। (আল্লাহ তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন)

রোগীদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক বা হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে রাখার প্রক্রিয়াও শুরু করে মুসলিমরাই। খোলাফায়ে রাশেদার আমল শেষ হওয়ার পরপর ৭০৬-৭০৭ খৃষ্টাব্দে কুষ্ঠরোগ মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ৬ষ্ঠ উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদ দামেস্কে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, সেই হাসপাতালে শুধুমাত্র কুষ্ঠরোগীরাই থাকবে এবং তাদের সাথে অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত রোগীদের রাখা যাবে না।

মহামারিতে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার এই অনুশীলন মুসলিম খেলাফত জুড়েই অসংখ্যবার প্রয়োগ করা হয়। ১৪৩১ সালে অটোম্যান খেলাফতের সময় বর্তমান তুরস্কের উত্তরাঞ্চলীয় শহর এডিরনে কুষ্ঠরোগীদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। পুরোটা উসমানিয়া খেলাফতের সময় আরো অনেক স্থানেই এ জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের তথ্যও পাওয়া যায়।

পাশাপাশি, স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে চলে যাওয়ার ধারণাও শুরু হয় অটোম্যান আমলেই। অর্থাৎ কোনো নাগরিক যদি নিজেকে অন্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, তাহলে নিজ দায়িত্ববোধ থেকে তিনি নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে কোয়ারেন্টিনে চলে যেতে পারেন। অপরের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যেগে এই কুরবানির নজরানাও স্থাপন করে মুসলিমরাই। জানা যায়, ১৮৩৮ সালে অটোম্যান কোয়ারেন্টাইন সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অটোম্যান এলাকাতেই স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়।

এরপর থেকে বিশ্বে যতগুলো মহামারি হয়েছিল বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় ১৯ শতকের গোড়ার দিকে যে ইয়েলো ফেভার নামক মহামারির উদ্ভব হয়েছিল, কিংবা এর আগে ১৭৯৩ সালে ফিলাডেলফিয়া, ১৮৫৬ সালে জর্জিয়ায় এবং ১৮৮৮ সালে ফ্লোরিডায় যে মহামারি হয়েছিল, কিংবা ১৯ শতকে কলেরা, গুটিবসন্তের মতো যে মহামারি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা ১৯১৮ সালে যে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েনঞ্জা মহামারি হয়েছিল প্রতিটিতেই মুসলিমদের প্রবর্তিত কোয়ারেন্টাইন কৌশল বাস্তবায়ন করে বেশ ভালো সফলতা পাওয়া যায়।

কোনো ধরনের রোগ, বিশেষত সংক্রামক ব্যধি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষের যাতায়াতকে সংকুচিত করার নাম হলো কোয়োরেন্টাইন। যারা এ ধরণের রোগের ঝুঁকিতে আছেন, অথচ তাদেরকে এখনো এই জাতীয় রোগে আক্রান্ত বলে সনাক্ত করা হয়নি তাদের চলাফেরাকেও এই কোয়ারেন্টাইনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কোয়ারেন্টাইনের একটি সমার্থক শব্দ হলো কর্ডন স্যানিটায়ার। কর্ডন স্যানিটায়ার হলো কোনো একটি বিশেষ এলাকায় কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়া আবার কাউকে বের হতেও না দেওয়া। মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন পশুপ্রাণীর মহামারি নিবারণের ক্ষেত্রেও এই কোয়ারেন্টাইন ধারণার অনুশীলন করা হয়।

কোয়ারেন্টাইন শব্দটি এসেছে কোয়ারেন্টিনা থেকে। এর মানে হলো ৪০ দিন। কোয়োরেন্টিনা শব্দটি ভেনেটিয়ান ভাষার একটি শব্দ। মূলত ১৪-১৫ শতকে যখন সেই অঞ্চলে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামের প্লেগের আবির্ভাব হয়, তখন সেখানকার জাহাজগুলোকে সাগরের উপকুলে কোনো যাত্রী বা নাবিক তোলার আগে ৪০ দিন অপেক্ষা করতে হতো। সেখান থেকেই এই কোয়ারেন্টিন শব্দের উৎপত্তি। ১৩৭৭ সালে আধুনিক ক্রোয়েশিয়ার একটি অঞ্চলে ৩০ দিনের কোয়ারেন্টিনের প্রচলন করা হয়। উল্লেখ্য ৩০ বা ৪০ দিনের কোয়ারেন্টিন প্লেগের মতো মহামারি নিয়ন্ত্রণে খুবই কার্যকরী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত