মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। একই সঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে শ্রমবাজার। যুদ্ধের ডামাডোল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশগুলোর আকাশসীমা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সর্বশেষ তথ্যমতে বাতিল করা হয়েছে ৩২০টি ফ্লাইট। এতে করে ভুক্তভোগী হয়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইন্স, হোটেল মোটেলসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যর বিভিন্ন দেশগামী শ্রমিকরা।
যারা সহায় সম্বল বিক্রি করে ভিসা ও টিকিটের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা যেতে পারছেন না। কবে যেতে পারবেন তারও ঠিক নাই। ততদিন তাদের চাকরি থাকবে কিনা এ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া অনেক প্রবাসী দেশে ছুটিতে এসেও বিপদে পড়েছেন। তারা সময়মতো কাজে যোগদান করতে পারছেন না। তারাও তাদের চাকরি হারানো নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। এর বাইরে ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে যারা দিনের হিসাব করে বাজেট নিয়ে গিয়েছিলেন তারাও কষ্টে রয়েছেন। অনেক হাজীর সঙ্গে থাকা টাকা শেষ হওয়ার পর এখন কেউ কেউ বাড়ি থেকে টাকা নিচ্ছেন আবার অনেকেই ঋণ করে দিন পার করছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা পুষিয়ে নিতে অনেক সময় লাগবে। স্বাভাবিক ফ্লাইট পরিচালনা না করায় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক, প্রবাসী, শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঠিক তেমনি অনেক আটকে পড়া হাজী, বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা আসতে পারছেন না। এখন পর্যন্ত কতো শ্রমিক ও প্রবাসী চাকরিজীবী আটকা পড়েছেন তার হিসাব না থাকলেও সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। এসব আটকে পড়াদের অনেকেই সময়মতো না গেলে বিপাকে পড়বেন। তবে কিছু বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে অসংখ্য আটকে পড়াদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আর দেশ থেকে কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করে মধ্যপ্রাচ্য পাঠানো হয়েছে।
এয়ারলাইন্স সূত্রগুলো বলছে, গত ৯ দিনে ২৪৮টি ফ্লাইট বিভিন্নভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ফ্লাইটে অনেক যাত্রী তাদের গন্তব্যে পৌঁছেছে। নিরাপত্তাজনিত সমস্যা স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে বাতিল হওয়া ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। তখন বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের টিকিট রি-শিডিউলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে এয়ারলাইন্স। বাড়তি চার্জ ছাড়াই টিকিট রি-শিডিউলের ঘোষণা দিয়েছে অধিকাংশ এয়ারলাইন্স।
সায়মন ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফসিয়া জান্নাত সালেহ মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির পুরোপুরি প্রভাব এসে আমাদের ওপর পড়েছে। কারণ বেশির ভাগ টিকিট আমরা বিক্রি করি মধ্যপ্রাচ্যর যাত্রীর কাছে। এ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার যাত্রীরাও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াত করেন। সেদিক দিয়েও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন করে কোনো টিকিট ইস্যু হচ্ছে না। আর পুরাতন টিকিট রিশিডিউল করা হচ্ছে। এয়ারলাইন্সগুলো তাদের পলিসি অনুযায়ী কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই টিকিট রিফান্ডের সুযোগ দিয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে দেশের এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন সেটি গোছাতে অনেক সময় লাগবে।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ও রিদম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহাগ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে পুরো এভিয়েশন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। শ্রমিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি এয়ারলাইন্স, ট্র্যাভেল এজেন্সির মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, কোভিডের সময় যে পরিস্থিতি হয়েছিল এখন একই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একটা অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে পার হচ্ছে এভিয়েশন খাত। এই খাতের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। ফ্লাইট পরিচালনা না করেও এয়ারক্রাফট পার্কিং করে রাখা হয়েছে কিন্তু চার্জ দিতে হবে। এগুলোর ক্ষেত্রে যদি কর্তৃপক্ষ কোনো উদ্যোগ নেয় তবে এয়ারলাইন্সগুলো কিছুটা স্বস্তি পাবে। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে আর এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে টিকে থাকা কঠিন হবে। তিনি বলেন, আমরা কিছু দুবাইতে ফ্লাইট পরিচালনা করছি। যাদের টিকিট কাটা ছিল তাদের কাছ থেকে কোনো চার্জ ছাড়া টিকিট রিশিডিউল করে দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য রুটের যাত্রীদেরও একই সুবিধা দেয়া হবে।
ইউনাইটেড লিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের জিএসএ আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধের কারণে প্রতিদিনই ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এতে করে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক বা চাকরির উদ্দেশ্যে যারা মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার কথা- তারা যেতে পারছেন না। মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা আসতে পারছেন না। এজন্য দেশের বেশির ভাগ তারকা হোটেল ফাঁকা। ওমরাহ্ করতে যাওয়া হাজীরা আটকা পড়েছেন। তারা খুবই কষ্টে আছেন। কারণ যে বাজেট নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছেন সেটি শেষ হয়ে এখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
হাবের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য। ইউএস-বাংলা, এমিরেটস কিছু ফ্লাইট পরিচালনা করে দুবাই থেকে আটকে পড়া অনেককে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি বলেন, যখনই আমরা মনে করেছিলাম মার্চের পর থেকে অনেক পরিবর্তন আসবে তখনি যুদ্ধ পরিস্থিতি সব বদলে দিয়েছে। বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এভিয়েশন খাত। উৎস: মানবজমিন।