প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভুলে যাবেন না, ‘আপনার মাইনে দেয় ওই গরীব কৃষক’

জাকির হোসেন তমাল : ষাটোর্ধ্ব তিন ব্যক্তি রাস্তার পাশে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের সেই ছবি মুঠোফোনে তুলছেন সাইয়েমা হাসান। ওই তিন ব্যক্তির অর্ধেক বয়সী বা তারও কম হবেন ছবি তোলা সেই নারী। দাম্ভিক সেই নারীর আলাদা একটা পরিচয় আছে, তিনি সরকারি কর্মচারী। দায়িত্বে ছিলেন যশোরের মনিরামপুরের সহকারী কমিশনার, ভূমি (এসি ল্যান্ড) হিসেবে।

করোনাভাইরাস সম্পর্কে মানুষকে সচেতনা করতে মাঠে নেমে গতকাল শুক্রবার বাবার বয়সী তিনজনকে চান ধরে ওঠবস করাতে ওই নারীর বিবেকে বাধেনি। মুখে মাস্ক না পরার কারণে প্রকাশ্যে খেটে খাওয়া মানুষদের কান ধরিয়েছেন তিনি। দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়েও বিবেকবোধ গড়তে পারেননি সেই নারী। হয়তো তিনি মানুষের মতো, কিন্তু মানুষ ও পশুর পার্থক্যকারী সেই বিবেকের উপস্থিতি তার মাঝে নেই। তাই গোটা দেশের মানুষ তাকে সেই বিবেকের শিক্ষা দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। সেকারণে বাধ্য হয়ে সেই কর্মচারীকে তার পদ থেকে সরাতে বাধ্য হয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

কয়েক বছর আগে আমরা এক এসি ল্যান্ডের গল্প গণমাধ্যমে পড়েছিলাম। রাজশাহীর পবা উপজেলার সেই এসি ল্যান্ডের নাম শাহাদত হোসেন। তিনি মানুষের সেবায় নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এক কথায় গরীব বা গ্রামের কৃষকদের সরাসরি সেবা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন গোটা দেশব্যাপী। তার সেই কাজের মডেল পরবর্তী সময়ে দেশের অনেক এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে প্রয়োগ করার বিষয়টিও আমরা পড়েছিলাম।

কিন্তু সেই রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া সাইয়েমা হাসান মানবসেবা শিখতে পারেননি। এসি ল্যান্ডের দায়িত্বে ছিলেন ঠিকই, কৃষককে ভালোবাসতে পারেননি। তিনি শুধু ক্ষমতার চর্চা করতে শিখেছেন। তাই সুযোগ পেয়ে ক্ষমতা দেখিয়েছেন গ্রামের খেটে খাওয়া বৃদ্ধদের ওপর। যদিও তার দায়িত্ব ছিল মানুষকে সচেতন করা, কিন্তু তিনি শাস্তি দিয়েছেন। সেই অপরাধে এই এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে যে দেশে সাইয়েমা হাসানের জয়জয়কার, সেখানে ক্ষমতাবানদের বিচার হয় না। তারও বিচার আমরা প্রত্যাশা করি না।

সাইয়েমা হাসানের মতো পদধারীদের দেখে নচিকেতার সেই গানের কথা মনে পড়ে গেল। তার কথার মতো এসব পদ-পদবির বদলে ভবঘুরে হওয়ার ভালো। যেমনটা নচিকেতা বলেছিলেন, ‘কেউ হতে চায় ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার/কেউ হতে চায় ব্যবসায়ী কেউ বা ব্যারিস্টার/কেউ চয় বেচতে রূপোয় রূপের বাহার চুলের ফ্যাশান/আমি ভবঘুরেই হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই কথাটা দিয়ে শেষ করতে চাই। সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ওই গরীব কৃষক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়…ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ইজ্জত করে কথা বলেন। ওরাই মালিক…।’ বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীকে বলব, মনে রেখ, এ স্বাধীন দেশ, এটা বিদেশ কলোনি নয়, পাকিস্তানি কলোনি নয়। যে লোককে দেখবা তার চেহারা বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো। ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়।’

সাইয়েমা হাসান হয়তো মনিরামপুরকে নিজের কলোনি বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার তাই ইচ্ছা পূরণ হলো না। আবার হয়তো কোথাও তিনি পদ পাবেন, সেখানে নিজের ক্ষমতা দেখাবেন। আপনি ভুলে যাবেন না, এটা স্বাধীন বাংলাদেশ।

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

সর্বাধিক পঠিত