প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলার দুর্ভিক্ষ : বিগত ও আসন্ন

মাসুদ রানা : দুর্ভিক্ষ শব্দের অর্থ খাদ্যের অভাব নয়, অন্তত বুৎপত্তিগত তথা শব্দের মূলগত অর্থে। তাহলে কী অর্থ দুর্ভিক্ষের? দুর্ভিক্ষ মানে ভিক্ষার অভাবÑ অর্থাৎ এমন একটি দেশ-দশা যেখানে-যখন ভিক্ষাও পাওয়া যায় না। যে ভাষায় এই দুর্ভিক্ষ শব্দের উৎপত্তি ও ব্যবহার, সে ভাষাভাষী মানুষের সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি ও ভিক্ষাপ্রাপ্তি একটি স্বাভাবিক অবস্থা। অর্থাৎ সে সমাজে কিছু মানুষের ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই, আর কিছু মানুষের ভিক্ষা দেওয়ার উপায় আছে। যা হোক, ভিক্ষাদাতারা ভিক্ষার্থীকে তখনই ভিক্ষা দিতে পারেন না, যখন তাদের ভিক্ষা দেওয়ার সঙ্গতি কিংবা ইচ্ছা কিংবা উভয়টি থাকে না। সে অর্থে দুর্ভিক্ষের অভিধার্থ ভিক্ষার অভাব হলেও এর নিহিতার্থ খাদ্যের অভাব বটে। ঐতিহাসিকভাবে, বঙ্গদেশে দুর্ভিক্ষ মানেই হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের খাদ্যাভাব থেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে গমন এবং ভিক্ষাপ্রাপ্তির অভাবে তাদের লাখে লাখে মরণ, আর ঠিক তখনই মুষ্ঠিমেয় মানুষের সম্পদে-বিত্তে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী ত্বরণ।
১৭৭০ সালে যখন সদ্য দখলদার ইংরেজ বেনিয়ারা বাংলা লুণ্ঠনের তা-বে মত্ত, তখন বাঙালি জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এক কোটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ভিক্ষার অভাবে। আর ঠিক তখনই কিছু লোক সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে পরবর্তীকালে নতুন অভিজাত শ্রেণি হয়ে উঠে। তারপর ১৯৪৩ সালের ব্রিটিশ শাসক ও তাদের দালাল ধনিক-বণিক ও মজুদদার-মুনাফাখোরদের কারসাজিতে আবারও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ৩০ লাখ বাঙালি। তখন মজুদদার-মুনাফাখোরেরা আরও ধনী হয়ে উঠে। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ হয় তাত না খেয়ে মৃত্যু ঘটে ১৫ লাখ বাঙালির, আর বিপরীতে কোটিপতি হয় উঠে শাসক আওয়ামী লীগের গণপরোয়াহীন অর্থনৈতিক নীতির কারণে। এটিই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার বিখ্যাত চৎড়াবৎঃু ধহফ ঋধসরহবং (১৯৮১) গ্রন্থে বলেছেন।
বর্তমানে করোনাভাইরসের প্যানডেমিক বা বিশ্বমারী বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের হুমকি তৈরি করেছে, তার অভিঘাত কী হবে রিমিট্যান্স ও রপ্তানিনির্ভর বাংলাদেশে, তা হয়তো আমাদের ধারণারও বাইরে। কতো বাঙালি প্রাণ হারাবে হিসেব-নকশা আমার জানা নেই। যদি চতুর্থ দুর্ভিক্ষ আসে এ বাংলায়, এবারও যে মুনাফালোভী মালিক শ্রেণিই আরও সম্পদশালী হবে এবং দরিদ্র শ্রেণির লোকেরা ভিক্ষার অভাবে মরবে সেই একই আওয়ালী লীগের নীতির কারণে, তার ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধনিকতোষণ অর্থবরাদ্দের ঘোষণা থেকে। তিনি দেশের সাধারণ দরিদ্র শ্রেণি কী হবে তাতে ভ্রƒক্ষেপ না করে পোশাক শিল্পের মালিকদের জন্য বরাদ্দ করেছেন ৫০০০ কোটি টাকা। শেখ হাসিনা যদিও বলেছেন এ টাকা থেকে মালিকেরা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবে, প্রশ্ন হচ্ছে তার গ্যারান্টি কী? বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মালিকেরা যেখানে উচ্চ চাহিদার উৎপাদনকালেই শ্রমিকদের স্বীকৃত বেতন দেয় নাÑ চুরি করে, সেখানে বিশ্বমন্দার হুমকির প্রেক্ষাপটে তারা সরকারি বরাদ্দ থেকে শ্রমিকদের বেতন দেবে।
বস্তুত শেখ হাসিনা শোষিত শ্রমিক শ্রেণিকে প্রায় চোর প্রকৃতির মালিক শ্রেণির মার্সি বা দয়ার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর অন্যান্য শিল্পের শ্রমিক, কর্মচারী, মজুর ও প্রান্তিক কৃষকদের কী হবে? আসলে এটি ব্যক্তি শেখ হাসিনের ইচ্ছার ব্যাপার নয়। এটি হচ্ছে তার দল আওয়ামী লীগের শ্রেণি আনুগত্য, যা ১৯৭৪ সালে যা ছিলো ২০২০ সালেও তাই আছে। আমার সত্যি কষ্ট লাগে ভাবলে যে, বাংলাদেশে দরিদ্র অসহায় মানুষের জন্য লড়ার কিংবা এমনকি দু’কথা বলার লোক নেই। ২৬ মার্চ যে তাদের দেশের ৪৯তম স্বাধীনতা দিবস, তাদের জীবনে বাস্তবে এর কোনো অর্থই নেই। ১৯৭১ সালে তবুও তাদের জন্য লড়ছে বলে কিছু মানুষ হাতে অস্ত্র নিয়েছিলো জয় বাংলা বলে, কিন্তু আজ তাও নেই। আছে চারদিকে বে-নজির নীরবতা, যার ভেতরে যেন শোনা যায় আরেকটি দুর্ভিক্ষের ধীর পদক্ষেপে কেঁপে উঠা বাংলা-মৃত্তিকার চাপা কান্না। আর আমি ৪৯ বর্ষ পূর্বে সেই মার্চে পাকহানাদার ঘাতক-ধর্ষক ও তাদের এ দেশীয় দালালদের হিং¯্র উল্লাসের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠা প্রতিরোধের দৃপ্ত ধ্বনি ‘জয় বাংলা’। বড়ই দুঃখের বিষয়, উনিশশ একাত্তরের নিপীড়িত বাঙালি মুক্তির ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি আজ বিশশ-বিশে নির্যাতকের মুখে হিংস্র হুঙ্কার, যা মানুষ শ্রবণেই সন্ত্রস্ত। ২৬/০৩/২০২০, ল-ন, ইংল্যা-

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত